মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ছিলেন অত্যন্ত মানবিক, সহানুভূতিশীল ও সংবেদনশীল ব্যক্তিত্ব, যিনি মানুষের কষ্ট, সুবিধা অসুবিধার ব্যাপারে সর্বদা সচেতন ও সচেষ্ট ছিলেন। তাহার আচরণে দয়া, ক্ষমা, নম্রতা ও গভীর সংবেদন শীলতার অপূর্ব সমন্বয় ছিল, যা বন্ধু শত্রু নির্বিশেষে সকলের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। তিনি মানুষের ভুলের সংশোধনেও পরম সৌজন্যবোধ বজায় রাখতেন। মহানবী (সাঃ) এর সংবেদনশীলতার কিছু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নিচে দেওয়া হলোঃ মানবিক আচরণ ও সহানুভূতিঃ তিনি সমাজের দুর্বল, এতিম ও দুস্থদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। তাদের কষ্ট দেখে তিনি বিচলিত হতেন।ভুল সংশোধনে সৌজন্যঃ কাউকে ভুল সংশোধন করতে হলে তিনি কঠোর শব্দ ব্যবহার করতেন না, বরং সৌজন্য ও ভালোবাসার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিতেন। শত্রুর প্রতিও সংবেদনশীলতাঃ মক্কায় কাফিরদের চরম অপমান ও অত্যাচারেও তিনি ধৈর্য ধারণ করতেন এবং মক্কা বিজয়ের দিন শত্রুদের ক্ষমা করে দিয়ে অনন্য সংবেদন শীলতার পরিচয় দেন। মানুষের সুবিধা অসুবিধায় সতর্কতাঃ কোনো কাজের কারণে মানুষের কষ্ট হতে পারে এমন বিষয়ে তিনি খুব সতর্ক থাকতেন। উম্মতের কল্যাণ চিন্তাঃ তিনি সর্বদা উম্মতের কল্যাণ ও হেদায়েতের জন্য চিন্তিত থাকতেন। সংক্ষেপে, রাসুল (সাঃ) এর সামগ্রিক জীবন ছিল মানবিক গুণাবলী ও সংবেদন শীলতার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত, যা কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য আদর্শ।
এখানে আমি নিচে তাহার সংবেদন শীলতার কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরছি। একদিন আল্লাহর রাসুল (সাঃ) ফজরের নামাজ পড়াচ্ছিলেন। ফজর নামাজ সাধারণত লম্বা কেরাত দিয়ে পড়া হয়। কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সাঃ) খুব দ্রুত নামাজ শেষ করে ফেলেন। নামাজ শেষে সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আজকে এত তাড়াতাড়ি নামাজ শেষ করে ফেললেন যে?
উত্তরে তিনি বললেন, নামাজের সময় আমি এক শিশুর কান্নার আওয়াজ পেলাম। আমার মনে হলো সেই শিশুর কান্নার কারণে তাহার নামাজরত মা খুব পেরেশানিতে পড়বে। (আখলাকুন নবীঃ ১৫৭)।
অর্থাৎ মাত্র একজন মুসুল্লির পেরেশানির কথা চিন্তা করে তিনি সাধারণ নিয়ম ভঙ্গ করে দ্রুত নামাজ শেষ করে ফেললেন! মানুষের সুবিধা অসুবিধার দিকে তিনি এতটাই খেয়াল রাখতেন।
রাসুলের (সাঃ) সময়ে কিছু লোক ছিল যারা মদিনার মসজিদে ঘুমাতেন। আল্লাহর রাসুল (সাঃ) মসজিদে ঢুকে কাউকে সালাম দিলে এত আস্তে সালাম দিতেন যেন শুধু ওই ব্যক্তিই শোনে, অন্যরা যেন জেগে না যায়। (সহিহ মুসলিমঃ ২০৫৫)।
একবার মদিনা থেকে অনেক দূরের এক অঞ্চল থেকে সাহাবি মালিক বিন হুওয়াইরিস (রাঃ) তাহার গোত্রের কিছু মানুষের সাথে আল্লাহর রাসুলের (সাঃ) কাছে এসেছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাসুল (সাঃ) থেকে ইসলাম শিখে নিজের গোত্রের মানুষকে তা শেখানো। তারা মদিনায় বিশ দিন থাকার পর আল্লাহর রাসুলের (সাঃ) মনে হলো তাদের নিশ্চয় এখন বাড়িতে যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সাধারণত বাড়ি থেকে দূরে থাকলে সবারই বাড়ি যেতে মন কামড়ায়। মা-বাবা, সন্তানাদি ও আপনজনের চেহারা দেখতে ইচ্ছা করে। কাজেই রাসুল (সাঃ) তাদের ডাকলেন এবং বাড়িতে কারা কারা আছে জিজ্ঞাসা করলেন। তারা সব খুলে বললেন। এরপর তিনি বললেন, এবার তোমরা নিজ নিজ পরিবারের কাছে ফিরে যাও, এবং তাদের সাথে থাকো। (আখলাকুন নবীঃ ১৫৮, সহিহ মুসলিমঃ ৬৭৪)।
শুধু বড়দের নয়, বাচ্চাদের মন-মানসিকতার দিকেও তিনি লক্ষ্য রাখতেন। তাদের সাথে তাদের মতো করেই আচরণ করতেন। তাদের মধ্যে যে চপলতা ও খেলাধূলার আগ্রহ আছে, একে গুরুত্ব দিতেন।
রাসুলের (সাঃ) খাদেম হজরত আনাস (রাঃ) বলেন, রাসুল (সাঃ) ছিলেন সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের মানুষ এবং তাহার হৃদয় ছিল সবার চেয়ে উদার। তিনি আমাকে একদিন এক কাজে পাঠিয়েছিলেন, আমি বের হয়ে দেখি শিশুরা খেলছে, আমিও তাদের সঙ্গে খেলতে শুরু করি। হঠাৎ আমার মনে হলো একজন আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি তাকিয়ে দেখলাম আল্লাহর রাসুল (সাঃ) দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছেন। বললেন, কী ব্যাপার ছোট্ট আনাস, তোমাকে যেখানে যেতে বলেছি সেখানে গিয়েছ? আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সাঃ) এক্ষুণি যাচ্ছি!
আল্লাহর কসম! আমি ৯ বছর তাহার খেদমত করেছি, এর মাঝে আমি কোনো কাজ করলে তিনি কখনও বলেননি, এই কাজ করেছো কেন আর কোনো কাজ না করলে তিনি কখনও বলেননি এই কাজটা করোনি কেন। (সহিহ মুসলিমঃ ২৩০৯, ২৩১০)।

মোঃ আরিফুল ইসলাম, পাবনা জেলা প্রতিনিধি 










