চার দশকের দীর্ঘ কর্মজীবন। হাজার হাজার চিঠি মানুষের দুয়ারে পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। কখনও সুখবর, কখনও চাকরির নিয়োগপত্র, আবার কখনও প্রিয়জনের মৃত্যুর মতো কঠিন বার্তা বহন করেছেন। দীর্ঘ ৪০ বছরের চাকরি জীবনের শেষ সপ্তাহে এসে তেমনই এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন প্রবীণ ডাকপিয়ন রতনবাবু। একটি নাম-ঠিকানাহীন রহস্যময় চিঠি তাঁকে শিখিয়ে দিল জীবনের পরম সত্য— মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার ইট-কাঠের বাড়ি কিংবা পদবিতে নয়, তার আচরণ, মমতা ও মানবিকতায়।
ডাকঘর সূত্রের খবর, অবসরগ্রহণের কয়েক দিন আগে অফিসের এক কোণে ধুলো জমে থাকা একটি পুরোনো খাম নজর কাড়ে রতনবাবুর। খামের গায়ে কোনো বাড়ি নম্বর বা গ্রামের নাম লেখা ছিল না; কেবল লেখা ছিল— “যার হৃদয়ে এখনো দয়া-মায়া বেঁচে আছে, তার হাতে পৌঁছে দেবেন।” সহকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করলেও, রতনবাবু খামটি ফেলে দিতে পারেননি। এক অজানা টানে চিঠিটি নিজের কাছে রেখে দেন।
সেদিন কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তায় এক ক্ষুধার্ত বৃদ্ধার দেখা পান রতনবাবু। কোনো কিছু না ভেবেই নিজের টিফিনের খাবারটি তিনি তুলে দেন সেই বৃদ্ধার হাতে। একটু পরেই দেখতে পান, ব্যাগ ছিঁড়ে বইপত্র ছড়িয়ে পড়ে কান্নাকাটি করছে এক স্কুলপড়ুয়া শিশু। রতনবাবু পরম স্নেহে ব্যাগটি সেলাই করিয়ে বইগুলো গুছিয়ে দেন।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে কৌতূহলবশত খামটি খোলেন তিনি। ভেতরে থাকা একটি ছোট্ট কাগজে লেখা ছিল:
”অভিনন্দন! এতদিন ধরে এই চিঠির সঠিক ঠিকানা খুঁজছিলাম, আজ পেলাম। মানুষের আসল ঠিকানা তার বাড়ি নয়, তার হৃদয়। চিঠিটি আপনার হাতে পৌঁছানো মানেই— আপনার হৃদয়ই এর আসল ঠিকানা।”
পরদিন ডাকঘরের আনুষ্ঠানিক বিদায়সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রতনবাবুর কাছে জানতে চাওয়া হয় তাঁর দীর্ঘ চাকরি জীবনের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতার কথা। আবেগে চোখ ভিজিয়ে তিনি বলেন, “বাড়ির নম্বর ভুল হতে পারে, গ্রামের নাম বদলে যেতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা, সহানুভূতি আর মানবতার হৃদয়ই পৃথিবীর একমাত্র সঠিক ও চিরন্তন ঠিকানা।”
উপস্থিত সকলের করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। পদবি বা সম্পত্তি নয়, মানুষের পরিচয় যে তার মমত্ববোধে— রতনবাবুর এই অভিজ্ঞতা যেন সে সত্যকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিল।

স্টাফ রিপোর্টার 









