নেত্রকোনা জেলার গ্রামাঞ্চলে এখনো বন্ধ হয়নি বাল্যবিয়ের প্রবণতা। পারিবারিক চাপ, অসচেতনতা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে গড়ে ওঠা সম্পর্কের কারণে অনেক পরিবারই বাল্যবিয়ের আয়োজন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রশাসন ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের তৎপরতায় চলতি বছরের ১১ মাসে জেলায় ২১টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা হয়েছে।
জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের কাছে প্রায় ২১টি বাল্যবিয়ের আয়োজনের খবর আসে। এসব খবরের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ, বয়স যাচাই এবং প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমে বিয়েগুলো বন্ধ করা হয়। একই সময়ে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১৩৬ থেকে ১৪০টি উঠান বৈঠক আয়োজন করা হয়েছে।
সরেজমিনে জানা যায়, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী ২১ বছর পূর্ণ হয়নি এমন পুরুষ এবং ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি এমন নারীকে অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোনো এক পক্ষ কিংবা উভয় পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে সেই বিয়ে বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু আইন থাকা সত্ত্বেও নেত্রকোনার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিয়ের আয়োজন থেমে নেই।
বাল্যবিয়ে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়ায় এ ধরনের বিয়ের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ করা কঠিন। এ বিষয়ে জেলা পরিসংখ্যান অফিস কিংবা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়েও পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। ফলে অভিযোগের ভিত্তিতে প্রতিরোধ করা বিয়ের তথ্যই সরকারি কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে সামনে আসছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রে মেয়ের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ না হলেও পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আবার কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠলে অনেক পরিবার দ্রুত বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা সম্পর্কও এ ধরনের সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাল্যবিয়ের পরিণতি সব সময় সুখকর হয় না। অল্প বয়সে সংসারজীবনে প্রবেশের কারণে অনেক কিশোরীকে পড়াশোনা বন্ধ করে পারিবারিক দায়িত্ব নিতে হয়। বয়স ও মানসিক পরিপক্বতার অভাবে দাম্পত্য জীবনে নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব জটিলতার পরিণতি বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়।
নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় এমনই একটি ঘটনার কথা জানিয়েছেন নিজের ছেলেকে বাল্যবিয়ে দেওয়া এক বাবা শফিকুল ইসলাম। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, “আমরা বিয়ে করাতে চাইনি। দুজন সম্পর্ক করে বিয়ে করেছে। এখন তাদের বনিবনা হচ্ছে না। তাই কোর্টের মাধ্যমে তালাক দিতে হচ্ছে।”
নেত্রকোনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জিয়া উদ্দিন খান জিয়া বলেন, “অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলে পরবর্তী সময়ে নানা আইনি ও পারিবারিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
এ বিষয়ে নেত্রকোনা জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আব্দুর রৌফ সরকার বলেন, “বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও নারীদের সচেতন করা হচ্ছে। কোথাও বাল্যবিবাহের আয়োজনের খবর পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সম্মিলিতভাবে সচেতনতা বাড়ানো গেলে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

হারাধন সূত্রধর: পূর্বধলা (নেত্রকোনা) বিশেষ প্রতিনিধি 


















