প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে বুধবার জাতীয় সংসদে আলোচনার সময় পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা ঘিরে সরকারি দল ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সদস্যদের মধ্যে বিতর্ক হয়। বিএনপির সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ বিরোধী দলকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের ‘শোকর’ করার কথা বলার পর জামায়াতের একাধিক সদস্য তাৎক্ষণিক আপত্তি তুলে ওই বক্তব্যকে আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা বলে অভিযোগ করেন। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বক্তব্য পরীক্ষা করে ভুল ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হবে।
গত বুধবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনার সময় এ বিতর্কের সূত্রপাত হয়। বাজেট-পরবর্তী বিরোধী দলের মিছিলের সমালোচনা করতে গিয়ে আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদের বক্তব্যের পরই অনির্ধারিত এই আলোচনা শুরু হয়।
আয়াত তিলাওয়াতের পর তিনি বলেন, ‘শোকর করতে হবে জীবনের। শোকর করতে হবে বরাদ্দের। শোকর করতে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। শোকর করতে হবে আমাদের মাননীয় মন্ত্রীদের।’ এর পর তিনি আরও বলেন, ‘তারা শোকর করে না, কিন্তু অস্বীকার করে। সেই জন্য তাদের…কঠিন আজাব তাদের সম্মুখীন করতে হবে।’
এ অবস্থায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আলমগীর মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ একজন প্রবীণ সংসদ সদস্য; তার কাছ থেকে কোরআন-হাদিস নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য প্রত্যাশিত নয়। তবে বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা হবে। স্পিকার জানান, কোরআন-হাদিসের কোনো ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়ে থাকলে তা এক্সপাঞ্জ করা হবে। তিনি আরও বলেন, মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশে কোরআন-হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। এ সময় সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তার বক্তব্যে সমর্থন জানান।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তিনি বিতর্কে যেতে চান না; তবে বিরোধী দলের অভিযোগে এমন বার্তা যেতে পারে যে বিএনপির একজন সংসদ সদস্য কোরআনের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ একজন মাওলানা এবং প্রসঙ্গক্রমেই আয়াতটি উল্লেখ করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যদি আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করি আল্লাহ আমাদেরকে আরও বাড়িয়ে দেবেন।’ একই সঙ্গে তিনি বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে অপব্যাখ্যা না করার আহ্বান জানান। তার ভাষ্য, ৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশের এই সংসদে কোনো বক্তব্য ভুলক্রমেও ইসলামের প্রতি অবমাননাকর হলে তারা তার নিন্দা করবেন, কিন্তু বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।
এরপরও বিরোধী দলের সদস্যদের আপত্তি চলতে থাকলে স্পিকার বলেন, তিনি চান না সংসদে এমন স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে বিরূপ আলোচনা হোক। বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাদের মধ্যে হয়তো সরকারি দলের তুলনায় বেশি আলেম-ওলামা আছেন, তবে এটি নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘায়িত করা ঠিক হবে না।
পরে স্পিকার জামায়াতে ইসলামীর মুজিবুর রহমানকে বক্তব্যের সুযোগ দেন এবং তাকে অনুরোধ করেন, যেন বিতর্ক বাড়ে এমন কিছু না তোলা হয়। জবাবে মুজিবুর রহমান বলেন, সংশ্লিষ্ট আয়াতের নাজিলের প্রেক্ষাপট আল্লাহর নেয়ামত ভোগ করা মানুষের দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি বলেন, মানুষ যে শক্তি, বুদ্ধি বা বাকশক্তি পেয়েছে, তা আল্লাহর নিয়ামত; তাই সেই শক্তি দিয়ে আল্লাহর বিধিবিধানের পক্ষে কথা বলা উচিত। সরকারি দলের বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, বিরোধী দলকে বাজেটের প্রশংসা করতে হবে, না হলে আজাব আসবে—বিষয়টিকে সে অর্থে নেওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজনে একজন আলেমের মতামত নেওয়ার কথাও তিনি স্পিকারকে বলেন।
এ সময় স্পিকার মন্তব্য করেন, বিরোধী দলে মাদ্রাসা-শিক্ষিত আলেম সদস্য সরকারি দলের তুলনায় বেশি আছেন—এটি তিনি স্বীকার করেন; তবে ট্রেজারি বেঞ্চেও ‘দুই-একজন’ আছেন।
পরিস্থিতি শান্ত করতে পরে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়ান চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, মাহফুজ উল্লাহ একজন আলেম; তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলেছেন কি না, তা চাইলে স্পিকার জানতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি এ আলোচনা এখানেই শেষ করার আহ্বান জানান। এরপর স্পিকার আবার বাজেট আলোচনায় ফিরে যান।

ডিজিটাল রিপোর্ট 






















