ময়মনসিংহ , বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
আখতার হোসেন ফেসবুকে নির্বাচনী আর্থিক সহায়তা চাইলেন বিএনপির মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী প্রার্থিতা ফিরে পেতে এবার আপিল করবেন ​গফরগাঁওয়ে ধানের শীষের প্রার্থী আক্তারুজ্জামান বাচ্চু: সাধারণ মানুষের মাঝে আনন্দের জোয়ার তারেক রহমানের আজ কোথায় কোন কর্মসূচি রয়েছে প্রার্থীরা যা করতে পারবেন, যা পারবেন না ,নির্বাচনী প্রচারণা শুরু জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে খাদ্য মোড়কে ফ্রন্ট-অফ প্যাকেজ লেবেলিং (FOPL) সহ প্রবিধানমালা চুড়ান্ত করার দাবী : সবুজবাংলার শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে ঝুলন্ত অবস্থায় যুবকের মরদেহ উদ্ধার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবে কোন দল কোথায় শহীদ জিয়ার খাল খনন কর্মসূচি তারেক রহমানের পুনরায় চালুর ঘোষণা নির্বাচনী থিম সং উন্মোচন হলো
নোটিশ :
প্রতিটি জেলা- উপজেলায় একজন করে ভিডিও প্রতিনিধি আবশ্যক। যোগাযোগঃ- Email- matiomanuss@gmail.com. Mobile No- 017-11684104, 013-03300539.

মূল্যস্ফীতি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি উসকে দিতে পারে

  • ডিজিটাল ডেস্ক
  • আপডেট সময় ১০:০২:৪৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২০ বার পড়া হয়েছে

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে জাতীয় বেতন কমিশন। ফলে সর্বনিম্নে থাকা ২০তম গ্রেডে মূল বেতন আট হাজার ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে গ্রেড সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকছে।

গত বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ২১ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন চূড়ান্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছে। এর মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বেতন বৃদ্ধি সম্পর্কে পরিকল্পনা কমিশনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, বেতন বাড়ায় আমাদের তেমন লাভ হবে না। বেতন বাড়ানোর পরই দেখা যাবে বাজারে সব পণ্যের দাম দেড়-দুইগুণ বেড়ে গেছে। পণ্যের দাম কম থাকলে আমরা এই বেতন দিয়েই চলতে পারব। তাই বেতন বাড়ানোর চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বেশি জরুরি।

প্রস্তাবিত পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন-ভাতার জন্য চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ আছে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। নতুন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে এই ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যেতে পারে। কমিশনের প্রস্তাবে বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যাতায়াত ভাতা ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের পরিবর্তে দশম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

বাড়িভাড়া ভাতা প্রথম থেকে দশম গ্রেডে তুলনামূলক কম এবং ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডে তুলনামূলক বেশি রাখার কথা বলা হয়েছে।
পেনশনভোগীরাও পাচ্ছেন বড় সুবিধা। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ, ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পাওয়া ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পাওয়া ব্যক্তিদের ৫৫ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। ৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনধারীদের চিকিৎসা ভাতা ১০ হাজার টাকা এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে। এক বছরের হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমেছে বলা হলেও বাস্তবে পণ্যের দাম কমেনি; বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে মাত্র। তাঁর মতে, এই প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। তিনি বাজার কাঠামোতে স্বচ্ছতা আনার পাশাপাশি চড়া মূল্যস্ফীতির সময়ে খাদ্য ভর্তুকি ও সুবিধাভোগীর আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন।

দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ধরনের ব্যয়ের জন্য জনগণ ও অর্থনীতি প্রস্তুত কি না, তা যাচাই জরুরি। সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ না করে পে স্কেল বাস্তবায়ন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বেতন বৃদ্ধির ফলে বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়বে না। সরকার সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, পে-কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন একটি আলাদা ও জটিল বিষয় এবং সাধারণত এটি পর্যালোচনায় তিন থেকে চার মাস সময় লাগে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাওয়া অর্থনীতি এখনো মজুরি বাড়ানোর মতো সক্ষমতায় পৌঁছায়নি। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না বাড়লে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি টেকসই হবে না। বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে অর্থনীতি মন্দার পূর্বমুহূর্তে রয়েছে, যেখানে মজুরি বৃদ্ধির সুফল পাওয়া কঠিন।

মিলিয়ে নতুন পে স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে এলেও, বিপুল ব্যয় ও রাজস্ব ঘাটতির বাস্তবতায় এটি মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে কি না—এ প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আখতার হোসেন ফেসবুকে নির্বাচনী আর্থিক সহায়তা চাইলেন

মূল্যস্ফীতি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি উসকে দিতে পারে

আপডেট সময় ১০:০২:৪৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে জাতীয় বেতন কমিশন। ফলে সর্বনিম্নে থাকা ২০তম গ্রেডে মূল বেতন আট হাজার ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে গ্রেড সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকছে।

গত বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ২১ সদস্যের জাতীয় বেতন কমিশন চূড়ান্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করেছে। এর মাধ্যমে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বেতন বৃদ্ধি সম্পর্কে পরিকল্পনা কমিশনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, বেতন বাড়ায় আমাদের তেমন লাভ হবে না। বেতন বাড়ানোর পরই দেখা যাবে বাজারে সব পণ্যের দাম দেড়-দুইগুণ বেড়ে গেছে। পণ্যের দাম কম থাকলে আমরা এই বেতন দিয়েই চলতে পারব। তাই বেতন বাড়ানোর চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বেশি জরুরি।

প্রস্তাবিত পে স্কেল কার্যকর হলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন-ভাতার জন্য চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ আছে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। নতুন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে এই ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যেতে পারে। কমিশনের প্রস্তাবে বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যাতায়াত ভাতা ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের পরিবর্তে দশম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

বাড়িভাড়া ভাতা প্রথম থেকে দশম গ্রেডে তুলনামূলক কম এবং ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডে তুলনামূলক বেশি রাখার কথা বলা হয়েছে।
পেনশনভোগীরাও পাচ্ছেন বড় সুবিধা। মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ, ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পাওয়া ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পাওয়া ব্যক্তিদের ৫৫ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। ৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনধারীদের চিকিৎসা ভাতা ১০ হাজার টাকা এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে। এক বছরের হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমেছে বলা হলেও বাস্তবে পণ্যের দাম কমেনি; বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে মাত্র। তাঁর মতে, এই প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। তিনি বাজার কাঠামোতে স্বচ্ছতা আনার পাশাপাশি চড়া মূল্যস্ফীতির সময়ে খাদ্য ভর্তুকি ও সুবিধাভোগীর আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন।

দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ধরনের ব্যয়ের জন্য জনগণ ও অর্থনীতি প্রস্তুত কি না, তা যাচাই জরুরি। সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ না করে পে স্কেল বাস্তবায়ন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বেতন বৃদ্ধির ফলে বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়বে না। সরকার সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, পে-কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন একটি আলাদা ও জটিল বিষয় এবং সাধারণত এটি পর্যালোচনায় তিন থেকে চার মাস সময় লাগে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাওয়া অর্থনীতি এখনো মজুরি বাড়ানোর মতো সক্ষমতায় পৌঁছায়নি। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না বাড়লে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি টেকসই হবে না। বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে অর্থনীতি মন্দার পূর্বমুহূর্তে রয়েছে, যেখানে মজুরি বৃদ্ধির সুফল পাওয়া কঠিন।

মিলিয়ে নতুন পে স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে এলেও, বিপুল ব্যয় ও রাজস্ব ঘাটতির বাস্তবতায় এটি মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে কি না—এ প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।