দেশ জুড়ে শিক্ষকসংকটে ধুঁকছে শিক্ষা খাত। বর্তমানে সারা দেশে ৩৩ হাজারের বেশি বেসরকারি এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্ধলক্ষাধিক এন্ট্রি লেভেলের সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য। অথচ দেশের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই পড়াশোনা করে এসব প্রতিষ্ঠানে। শিক্ষকসংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদান দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জানা গেছে, এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৬৭ হাজার ২০৮টি শিক্ষক-প্রভাষক পদে নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছেন মাত্র ১১ হাজার ৭১৩ জন প্রার্থী। তাতে বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৫ হাজার ৪৯৫টি পদই শূন্য রয়ে গেল। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ এনটিআরসিএ গতকাল বুধবার দুপুরে শিক্ষক নিয়োগের সপ্তম বা বিশেষ এ নিয়োগ প্রক্রিয়ার ফল প্রকাশ করে।
এনটিআরসিএ-র নীতিমালা অনুযায়ী, ৩৫ বছরের বেশি বয়সি নিবন্ধনধারীরা নিয়োগে আবেদন করতে পারবেন না। এছাড়া যেসব প্রার্থীর নিবন্ধন সনদ তিন বছরের বেশি সময় আগে পাওয়া, তারাও এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হবেন না। এই দুই শর্তের কারণে নিবন্ধন সদনধারী দেড় লাখ প্রার্থী বারবার আবেদনের সুযোগ পাচ্ছেন না। এদিকে ১-১২তম নিবন্ধিত নিয়োগবঞ্চিত সনদধারী প্রার্থীদের নিয়োগের জন্য গত দুই বছর ধরে রাজপথে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষকরা। সম্প্রতি সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) নিবন্ধনধারী নিয়োগপ্রত্যাশী শিক্ষকদের দাবির কথা শুনেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত ১৫ জানুয়ারি দুপুরে রাজধানীর গুলশানে নিজ বাসভবন থেকে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে প্রবেশের পথে গাড়ি থেকে নেমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন তিনি। এ সময় চাকরিতে দ্রুত নিয়োগ, দীর্ঘসূত্রতা নিরসন এবং ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান আন্দোলনরত শিক্ষকরা। নিয়োগপ্রত্যাশী শিক্ষকদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। শিক্ষকদের আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। তারেক রহমানের এই আকস্মিক সাক্ষাতে উচ্ছ্বিসত হয়ে ওঠেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা।
এনটিআরসিএ জানিয়েছে, এবার সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে স্কুল-কলেজে ৫ হাজার ৭৪২ জন, মাদ্রাসায় ৪ হাজার ২৫৫ জন, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩৫৪ জন, কারিগরি বিষয় চালু থাকা সাধারণ স্কুলে ১ হাজার ১৫৫ জন এবং কারিগরি বিষয় চালু থাকা মাদ্রাসায় ২০৭ জন প্রার্থী নিয়োগ সুপারিশ পেয়েছেন। সুপারিশপ্রাপ্তদের তালিকা এনটিআরসিএ ওয়েবসাইটে (www.ntrca.gov.bd) ‘৭ম নিয়োগ সুপারিশ বিজ্ঞপ্তি (বিশেষ)—২০২৬’ সেবা বক্সে এবং http://ngi.teletalk.com.bd
নিয়োগ হয় যেভাবে :বেসরকারি এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজে শিক্ষক হতে চাইলে অবশ্যই শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণের সনদ থাকতে হয়। একসময় ঐ সনদধারীদের মধ্য থেকে শিক্ষক নিয়োগের যাবতীয় কাজ করত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ। স্থানীয় সংসদ সদস্য বা উপজেলা চেয়ারম্যানদের নেতৃত্বাধীন এসব পর্ষদের বিরুদ্ধে ‘নিয়োগ বাণিজ্য’সহ নানা অভিযোগ উঠতে থাকে। এই বাণিজ্য ঠেকাতে ২০১৫ সালের ২১ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ ও প্রত্যয়ন বিধিমালা সংশোধন করে। তাতে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মৌলিক পরিবর্তন আসে। ঐ বছরের ৩০ ডিসেম্বর নতুন নিয়মের পরিপত্র জারি করা হয়; যাতে বলা হয়—এনটিআরসিএ প্রতি বছর মেধার ভিত্তিতে যে প্রার্থীকে সুপারিশ করবে, তাকেই নিয়োগ দিতে হবে পরিচালনা পর্ষদকে। ফলে নিয়োগ বাণিজ্যের সুযোগ আর থাকেনি পরিচালনা পর্ষদের হাতে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নিবন্ধন সনদ পেতে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে অন্তত ৪০ শতাংশ নম্বর পেতে হয়। বর্তমানে নিবন্ধন সনদের মেয়াদ তিন বছর; এ সনদধারীরা ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত ১ হাজার টাকা ফি দিয়ে অনলাইনে আবেদন করতে পারেন। এ আবেদনে একজন প্রার্থী নিজ বিষয়ে ৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বেছে নিতে পারেন। নিবন্ধন পরীক্ষায় ঐ প্রার্থীর পাওয়া নম্বরের ভিত্তিতে তাকে ঐসব প্রতিষ্ঠানের একটিতে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। সুপারিশপত্র নিয়ে প্রার্থীরা নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগদান করে থাকেন।

ডিজিটাল রিপোর্ট 






















