ঈদ-উল-আযহা মানেই ত্যাগের উৎসব, আত্মশুদ্ধির এক মহান দৃষ্টান্ত। ইসলামের ইতিহাসে হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে উৎসর্গ করার যে নজির স্থাপন করেছিলেন, তা আজো মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনন্য শিক্ষা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, বর্তমান সমাজে কোরবানির সেই মূল চেতনা,বিনয়, ত্যাগ আর তাকওয়া ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। এর জায়গা দখল করে নিয়েছে এক শ্রেণির মানুষের সস্তা অহংকার, দেখনদারি (শো-অফ) এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতা।
আজকের দিনে কোরবানির ঈদ যেন হয়ে উঠেছে কার গরু কত বড়, কার বাজেট কত বেশি, আর কার পশুর ভিডিও ফেসবুকে কত দ্রুত ভাইরাল হবে তার এক নোংরা প্রতিযোগিতা। রাস্তাঘাট বন্ধ করে পশুর মিছিল করা, অতিরিক্ত দামের বড়াই করা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গরুর দামের স্ট্যাটাস দিয়ে মানুষের সামনে কৃত্রিম ধনী সাজার এক অসুস্থ মানসিকতা সমাজকে গ্রাস করেছে।
যেখানে আপনার প্রতিবেশী বা দেশের হাজার হাজার দরিদ্র মানুষ এক টুকরো মাংসের জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে, সেখানে শুধু লোক দেখানোর জন্য লাখ লাখ টাকা ওড়ানো কি সত্যিই কোরবানি? নাকি এটি চরম আত্মঅহংকার ও প্রদর্শনেচ্ছা? পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে আল্লাহর কাছে পশুর রক্ত বা মাংস পৌঁছায় না, পৌঁছায় কেবল বান্দার ‘তাকওয়া’ বা নিয়ত। কোরবানি যদি মানুষকে বিনয়ী হতে না শেখায়, লোভ ও অহংকার দূর করতে না পারে, তবে তা আর ইবাদত থাকে না; তা স্রেফ একটি ‘পশু জবাইয়ের উৎসব’-এ পরিণত হয়।
কোরবানির পশুর হাটগুলোকে ঘিরে যে নৈরাজ্য তৈরি হয়, তা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। হাট শেষ হবে, কিন্তু যে তীব্র জনদুর্ভোগ আর নোংরামির রাজত্ব তারা তৈরি করে দিয়ে যায়, তার জবাব কে দেবে? রাস্তাঘাট, ফুটপাত, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে পর্যন্ত জোরপূর্বক পশুর হাট বসিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচল স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। লাখ লাখ টাকার পশু কেনার সামর্থ্য থাকলেও, ন্যূনতম নাগরিক শৃঙ্খলা মানার মানসিকতা এই তথাকথিত ধর্মপ্রাণদের নেই। পুরো এলাকাকে গোবর আর মূত্রের ভাগাড়ে পরিণত করে এরা কোন ধরনের পুণ্য অর্জন করছেন, তা আজ এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন।
এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার প্রভাব শুধু পশুর হাট বা ফেসবুকের ওয়ালেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, এর চরম মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের। যত্রতত্র কোরবানি দিয়ে পুরো এলাকাকে রক্তাক্ত ও নোংরা করার এক জঘন্য ও বর্বর সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
একটি নির্মম সত্য: আমরা লাখ টাকা দিয়ে পশু কিনে ধার্মিক সাজার চেষ্টা করছি, অথচ কোরবানি শেষে নিজের বাড়ির সামনের রক্ত ও বর্জ্যটুকু পরিষ্কার করার ন্যূনতম দায়িত্ববোধটুকুও দেখাচ্ছি না।
সব দায়িত্ব যেন শুধু সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের! এই অলস ও দায়িত্বহীন মানসিকতার কারণে ঈদের পর দিনগুলোতে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়ায়, মশা-মাছির উপদ্রব বাড়ে এবং ডেঙ্গুর মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। ইসলাম যেখানে ‘পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অঙ্গ’ বলেছে, সেখানে কোরবানির বর্জ্য দিয়ে চারপাশ দূষিত করা চরম মোনাফেকী ছাড়া আর কিছুই নয়।
ইসলাম প্রদর্শনের ধর্ম না, এটি আত্মশুদ্ধির ধর্ম। এই ঈদে পশুর গলায় ছুরি চালানোর আগে আমাদের ভেতরের অহংকার, লোক দেখানো মনোভাব, লোভ আর পৈশাচিক মানসিকতাকে কোরবানি দিতে হবে।
হক আদায় করুন: কোরবানির মাংসের বড় অংশটি নিজের ফ্রিজে না জমিয়ে প্রকৃত অভাবী ও গরিব মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিন।
বর্জ্য পরিষ্কার নিজ দায়িত্বে: কোরবানি শেষ হওয়ামাত্রই প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্বে নিজ আঙ্গিনা, রাস্তা ও আশপাশ পরিষ্কার করুন। বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন এবং ব্লিচিং পাউডার বা স্যাভলন দিয়ে জীবাণুমুক্ত করুন। সিটি কর্পোরেশন আপনার ঘরের চাকর নয়; নাগরিক হিসেবে আপনার বর্জ্য পরিষ্কার করার প্রাথমিক দায়িত্ব একান্তই আপনার।
কোরবানিকে দেখনদারির হাতিয়ার ও সমাজকে নোংরা করার অসিলা বানাবেন না। আসুন, চারপাশ পরিষ্কার রেখে এবং গরিবের মুখে হাসি ফুটিয়ে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষাকে ধারণ করি। তবেই আমাদের কোরবানি আল্লাহর দরবারে কবুল হবে।

এ কে এম ফখরুল আলম(বাপ্পী চৌধুরী) 




















