আজ ৩ মে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। সারা বিশ্বে যখন সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন আমাদের দেশের সাংবাদিকতার মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা আজ সময়ের দাবি। একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় গণমাধ্যমকে। কিন্তু সেই স্তম্ভ যদি আজ রাজনৈতিক দালালি আর লেজুড়বৃত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে রাষ্ট্রের মুক্তি আসবে কোথা থেকে?
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যে রাষ্ট্রে স্বাধীন সাংবাদিকতা বিক্রি হয়ে যায়, সে রাষ্ট্র কখনো পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারে না। রাষ্ট্রে যা ঘটে, তার প্রকৃত প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয় মুক্ত গণমাধ্যমের আয়নায়। কিন্তু যখন সেই আয়নাটিই ধোঁয়াটে হয়ে যায়, তখন সত্য ঢাকা পড়ে যায় মিথ্যার আড়ালে। গণমাধ্যম হলো রাষ্ট্রের শিক্ষক এবং প্রতিটি রাষ্ট্র পরিচালনার ‘ছাঁকনি’। এই ছাঁকনিতেই সরকারের ভুলত্রুটিগুলো ধরা পড়ে এবং সরকার নিজেকে সংশোধন করার সুযোগ পায়। কিন্তু আজ সেই সংশোধন প্রক্রিয়া কি সচল আছে?
একটি ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পরিবর্তিত তথ্য যখন সাংবাদিকরা সামনে নিয়ে আসেন, তখন জনগণের সাথে সরকারের দূরত্ব তৈরি হয়। সত্য আড়াল করার ফলে জনগণ ও সরকার একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে জাতি এক কঠিন বিভ্রান্তির সম্মুখীন হয়। অথচ একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যম যেখানে সচল, সেখানে জনগণের মর্যাদা ও অধিকার তত বেশি সংরক্ষিত।
বাস্তবতা অত্যন্ত নির্মম। আজ অধিকাংশ গণমাধ্যম ও সাংবাদিক রাজনৈতিক দলগুলোর অন্ধ অনুসারী বা লেজুড়ভিত্তিক চামচামিতে ব্যস্ত। ক্ষমতার পালাবদল হওয়ার সাথে সাথেই একদল তথাকথিত সাংবাদিক ডিগবাজি খেয়ে শাসকদলের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে। তারা সারাক্ষণ অন্যায়, অনিয়ম আর দুর্নীতিকে আড়াল করতে ব্যস্ত থাকে। এই ‘চামচামি’র সংস্কৃতির কারণেই সাংবাদিকতা আজ জনগণের কাছে তার কাঙ্ক্ষিত শ্রদ্ধা হারাচ্ছে। সাধারণ মানুষের মুখে আজ আক্ষেপের সুরে শোনা যায়— আগেকার দিনে বিত্তবানরা ঘর পাহারার জন্য যা পুষতেন, আজ অনেক রাজনৈতিক নেতা সাংবাদিকদের সেই একই কাজে ব্যবহার করছেন। এটি এই মহান পেশার জন্য চরম অপমানের।
এই অন্ধকারের মাঝেও কিছু সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক এখনো বেঁচে আছেন। তারা প্রতিকূল পরিবেশের সাথে লড়াই করে, জেল-জুলুম উপেক্ষা করে ন্যায়ের পক্ষে কলম ধরে যাচ্ছেন। তারা কোনো দল বা প্রশাসনের দালালি করেন না; তারা করেন সত্যের আরাধনা। আজো এ দেশের সাধারণ মানুষ যেটুকু ন্যায্য অধিকার পাওয়ার আশা রাখে, তা এই মুষ্টিমেয় সাহসী সাংবাদিকদের অবদানের কারণেই সম্ভব হচ্ছে। তারাই রাষ্ট্রের প্রকৃত অতন্দ্র প্রহরী।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে আমাদের শপথ হওয়া উচিত— সাংবাদিকতা হবে জনগণের পক্ষে, কোনো নির্দিষ্ট দলের পক্ষে নয়। দালালির তকমা মুছে ফেলে সাংবাদিকরা যদি আবার সত্যের পথে ফিরে আসেন, তবেই রাষ্ট্র ও সমাজ মুক্তি পাবে। মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকতা কোনো প্রভুর সেবা নয়, বরং এটি হলো গণমানুষের কাছে দায়বদ্ধ এক পবিত্র আমানত।

এ কে এম ফখরুল আলম (বাপ্পী চৌধুরী) 






















