নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রামপুর ইউনিয়নে অবস্থিত সুন্দলপুর সাউথ-১ অনুসন্ধান কূপে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স) জানিয়েছে, এই কূপের দুটি পৃথক জোনে প্রায় ৯৭ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) গ্যাসের মজুদ রয়েছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ভোক্তা পর্যায়ের মূল্য বিবেচনায় এই গ্যাসের আনুমানিক বাজারমূল্য ৫ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা।
গত সোমবার (২ নভেম্বর) কূপে অগ্নি প্রজ্বালনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্যাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। নতুন এই গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান দেশের জ্বালানি খাতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করেছে। তবে গ্যাসের প্রকৃত প্রবাহ, উৎপাদনক্ষমতা এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য পরিমাণ জানতে আরও কিছুদিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হবে।
যেভাবে মিলল সন্ধান
বাপেক্স সূত্রে জানা যায়, গত ৮ জুলাই নিজস্ব ‘বিজয়-১০’ রিগ ব্যবহার করে সুন্দলপুর সাউথ-১ অনুসন্ধান কূপের খননকাজ শুরু হয়। প্রায় ৩ হাজার ২৮৯ মিটার গভীরতা পর্যন্ত খনন শেষে কূপটির দুটি পৃথক জোনে গ্যাসের উপস্থিতি মেলে। পরে অগ্নি প্রজ্বালনের মাধ্যমে এর সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বাপেক্স পরিচালিত ত্রিমাত্রিক সিসমিক জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এই কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিক হিসাবে কূপটির দুটি জোনে প্রায় ৯৭ দশমিক ৬৯ বিসিএফ বা ৯ হাজার ৭৬৯ কোটি ঘনফুট গ্যাসের মজুদ পাওয়া গেছে।দৈনিক উৎপাদন নিয়ে প্রাক্কলন
নতুন এই কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক কতটুকু গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। বিডিনিউজ২৪ ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে দৈনিক ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট, আজকের পত্রিকার প্রতিবেদনে প্রায় ১০ মিলিয়ন এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
তবে এই সংখ্যাগুলো এখনো প্রাথমিক। কূপটির প্রকৃত উৎপাদনক্ষমতা ও প্রবাহ নিশ্চিত করতে ড্রিল স্টেম টেস্ট (ডিএসটি) পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ ডিএসটি পরীক্ষা
ড্রিল স্টেম টেস্ট বা ডিএসটি হলো কূপের ভেতরের গ্যাসের প্রবাহ, চাপ ও উৎপাদনক্ষমতা যাচাইয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। এই পরীক্ষার মাধ্যমেই সুনির্দিষ্টভাবে জানা সম্ভব—কূপ থেকে কী পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করা যাবে, এর চাপ কেমন এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন বজায় রাখা সম্ভব কি না।
প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, কূপটিতে গ্যাস ছাড়াও তেল কিংবা অন্য কোনো উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ে আগামী ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে। এই পরীক্ষা শেষেই পূর্ণাঙ্গ সম্ভাবনা ও উত্তোলনের রূপরেখা স্পষ্ট হবে।
২০ বছর উত্তোলনের পরিকল্পনা
বাপেক্সের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা অনুযায়ী, সুন্দলপুর সাউথ-১ কূপ থেকে আগামী ২০ বছর পর্যন্ত গ্যাস উত্তোলনের লক্ষ্য রয়েছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করবে কূপটির ধারাবাহিক উৎপাদনক্ষমতা, গ্যাসের চাপ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সক্ষমতার ওপর।
জ্বালানি খাতে সম্ভাব্য প্রভাব
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার কারখানা এবং আবাসিক খাতে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ব্যাপক। স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান কমাতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনা অনুযায়ী এই কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন করে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হলে তা দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর দেশের নির্ভরতা কমাতেও এটি সহায়ক হবে।
সব মিলিয়ে, কোম্পানীগঞ্জের সুন্দলপুর সাউথ-১ কূপে গ্যাসের এই সন্ধান দেশের জ্বালানি খাতে এক বড় অগ্রগতি। এখন সবার নজর আগামী ১৫ দিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলের দিকে, যা নির্ধারণ করবে এই নতুন ক্ষেত্রটি দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি চাহিদা পূরণে ঠিক কতখানি অবদান রাখতে পারবে।

স্টাফ রিপোর্টার 


















