বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম আলোচিত নাম ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ (পিএলসি) । একসময় দেশের সবচেয়ে লাভজনক ও আমানতনির্ভর ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি গত এক দশকে মালিকানা, পরিচালনা পর্ষদ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ১৯৮৩ সালের ৩০ মার্চ কার্যক্রম শুরু করে। এটি ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম শরিয়াহভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একটি। প্রতিষ্ঠার সময় দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ছিল। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ইসলামী উন্নয়নভিত্তিক সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ ব্যাংকটির ভিত্তি শক্তিশালী করে।
প্রতিষ্ঠালগ্নে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ, ইসলামী অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকটির সঙ্গে এমন ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়, যাদের আদর্শিক সম্পর্ক ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর -এর সঙ্গে। যদিও ব্যাংকটি কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ছিল না।
২০০০ সালের পর ইসলামী ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করে। আমানত সংগ্রহ, প্রবাসী আয় আহরণ, গ্রাহকসেবা এবং শাখা বিস্তারের মাধ্যমে ব্যাংকটি ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যায়।
ব্যাংকটির সমর্থকদের দাবি, প্রতিষ্ঠাতা দর্শন ও পূর্ববর্তী পরিচালনা কাঠামোর কারণেই ইসলামী ব্যাংক জনগণের আস্থা অর্জন করেছিল। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাংকটির জনপ্রিয়তা ছিল উল্লেখযোগ্য।
২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা পর্ষদে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ওই সময় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ-এর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকটির শেয়ার ক্রয় করে প্রভাবশালী অবস্থানে চলে আসে।
এরপর ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায়। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, এই পরিবর্তনের পেছনে তৎকালীন সরকার ও প্রভাবশালী মহলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন ছিল।
অন্যদিকে সরকারপন্থী বিশ্লেষকরা দাবি করেছিলেন, ব্যাংকটিকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রভাব বলয় থেকে বের করে আনার জন্যই এসব পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল।
ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, মূল বিতর্কের কারণ তিনটি— পরিচালনা পর্ষদের আকস্মিক পরিবর্তন,বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ নিয়ে প্রশ্ন, এবং রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ।
পরবর্তীতে ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের ঋণনীতি, করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং আর্থিক অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। ব্যাংকের কিছু আর্থিক সূচক নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়।
সমালোচকদের ভাষ্য, ব্যাংকটির দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক সংস্কৃতি ভেঙে যাওয়ার ফলে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইসলামী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শনের সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও পেশাজীবীদের আবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
তাদের মতে, ভবিষ্যতে পরিচালনা পর্ষদে ইসলামী অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ ব্যাংকার, করপোরেট গভর্ন্যান্স বিশেষজ্ঞ এবং স্বাধীন পরিচালকরা বেশি ভূমিকা পেলে ব্যাংকটির প্রতি আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, অতীতে যে কোনো সরকার যখন ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে, তখন তা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তাদের মতে, ভবিষ্যতে যদি কোনো রাজনৈতিক শক্তি ইসলামী ব্যাংককে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করে, তাহলে একই ধরনের সংকট আবারও দেখা দিতে পারে।
তারা বলছেন, দেশের বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র না বানিয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালনা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামী ব্যাংকের ইতিহাস বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রতিষ্ঠা, দ্রুত উত্থান, মালিকানা পরিবর্তন এবং পরবর্তী বিতর্ক সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি ব্যাংকের গল্প নয়, বরং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবের প্রভাব সম্পর্কেও একটি বড় শিক্ষা।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যাংকটিকে যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার আওতায় পরিচালনা করা যায়, তবে ইসলামী ব্যাংক আবারও দেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

এ কে এম ফখরুল আলম(বাপ্পী চৌধুরী) 




















