ময়মনসিংহ , সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ১২ জেলায় ঝড়ের পূর্বাভাস, নৌযান চলাচলে সতর্কবার্তা সীমান্ত হত্যা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ‘জাতির জন্য লজ্জার’ বলেছেন নাহিদ ইসলাম রামিসা হত্যা: ফাঁসির দড়িতে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তার ময়মনসিংহের গৌরীপুরে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু, গ্রামে শোকের ছায়া ​রামিসা হত্যা: জবানবন্দিতে উঠে এল নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা এত প্রকল্প হয়, বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করার প্রকল্প হয় না বলেছেন ফখরুল এনসিপিকে জামায়াতের আরেকটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানো হচ্ছে বললেন রাশেদ খাঁন সংবিধান সংস্কার যা হওয়ার হয়ে গেছে, এখন কেবল সংশোধন হবে জানিয়েছেন চিফ হুইপ ধোবাউড়ায় বালুভর্তি ট্রাকসহ কংস নদের বেইলি ব্রিজ ধস, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন জনভোগান্তি দূর করতে স্বেচ্ছাশ্রমে সড়ক সংস্কার করল পূর্বধলা বিএনপি
নোটিশ :
প্রতিটি জেলা- উপজেলায় একজন করে ভিডিও প্রতিনিধি আবশ্যক। যোগাযোগঃ- Email- matiomanuss@gmail.com. Mobile No- 017-11684104, 013-03300539.

চুয়াডাঙ্গায় কামারপল্লীতে দম ফেলার ফুসরত নেই: তৈরিতে ব্যস্ততা, লাভের খাতায় হতাশা

পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র ৮ দিন বাকি। মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই ধর্মীয় উৎসবকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গা জেলার কামারপল্লীগুলোতে শুরু হয়েছে উৎসবমুখর কর্মব্যস্ততা। কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার জন্য প্রয়োজনীয় দা, ছুরি, চাপাতি ও বঁটির চাহিদা বাড়ায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে কামারদের অবিরাম পরিশ্রম। চারদিকে এখন শুধুই হাতুড়ি পেটানোর ‘ঠুং ঠাং’ শব্দ আর হাপরের বাতাস। কয়লার গনগনে আগুনে পোড়ানো লাল লোহা দক্ষ কারিগরের হাতের ছোঁয়ায় রূপ নিচ্ছে ধারালো অস্ত্রে।

​বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এই ঈদ মৌসুমটিই কামারদের জন্য সবচেয়ে ব্যস্ততম এবং উপার্জনের প্রধান সময়। তবে বিক্রি ও ব্যস্ততা বাড়লেও কাঁচামালের চড়া দাম এবং হাড়ভাঙা খাটুনির তুলনায় কাঙ্ক্ষিত লাভ না হওয়ায় কারিগরদের মুখের এই হাসি কেবলই সাময়িক।

হাট-বাজারে বেচাকেনার ধুম
​চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কামারশালাগুলোতে নতুন সরঞ্জাম তৈরির পাশাপাশি পুরোনো অস্ত্রে শান দেওয়ার ধুম পড়েছে। দোকানের সামনে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আকারের দা, ছুরি ও চাপাতি। আকার, ওজন ও লোহার মানভেদে এগুলোর দামেও রয়েছে ভিন্নতা।
​বাজারে বর্তমানে সরঞ্জামাদির দরদাম:
* ​সাধারণ ছুরি: ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা
* ​দা: ১,০০০ থেকে ১,২৫০ টাকা
* ​বঁটি: ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা
* ​পশু জবাইয়ের বড় ছুরি: ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা
* ​পুরোনো ছুরি শান দেওয়া: ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা (কাজের মানভেদে)
​অনেক ক্রেতাই ভিড় এড়াতে আগেভাগে পছন্দের সরঞ্জাম কিনছেন বা শান দিয়ে নিচ্ছেন। দামুড়হুদার ডুগডুগি বাজারে আসা ক্রেতা শরিফুল ইসলাম জানান, ঈদের বেশি দিন বাকি নেই বলে তিনি নতুন দা-ছুরি কিনতে এসেছেন। তবে অন্য বছরের তুলনায় এবার দাম কিছুটা চড়া। রাজু নামের আরেক ক্রেতার অভিযোগ, ঈদকে পুঁজি করে বিক্রেতারা কিছুটা বাড়তি দাম নিচ্ছেন।
​উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিতে কমছে লাভ

কার্পাসডাঙ্গা বাজারের কারিগর জিয়ারুল রহমান জানান, লোহা, কাঠের হাতল ও কয়লার দাম হু হু করে বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিক্রি বাড়লেও লভ্যাংশ আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। দিন-রাত কাজ করেও সময়মতো সব অর্ডার বুঝিয়ে দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
​আরেক কারিগর আলামিন হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সারাদিন তীব্র আগুনের পাশে বসে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়। এতে নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়, কিন্তু সেই তুলনায় আমাদের মজুরি অনেক কম।”
​সংকটে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্যবাহী লোহাশিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন চুয়াডাঙ্গার শত শত কামার পরিবার। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এর ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। কারিগর সুমন আলী জানান, কষ্ট বেশি কিন্তু আয় কম হওয়ায় নতুন প্রজন্মের তরুণরা এই পেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার পৈতৃক পেশা পরিবর্তন করছেন।

​স্থানীয় কারিগর ও সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী এই হস্তশিল্প আজ হুমকির মুখে। সরকার যদি আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ এবং স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতো, তবে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হতো। আসন্ন কোরবানির ঈদ চুয়াডাঙ্গার কামারদের মুখে সাময়িক হাসি ফুটিয়েছে সত্যি, তবে এই হাসিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ, আর্থিক প্রণোদনা ও দীর্ঘমেয়াদি

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ১২ জেলায় ঝড়ের পূর্বাভাস, নৌযান চলাচলে সতর্কবার্তা

চুয়াডাঙ্গায় কামারপল্লীতে দম ফেলার ফুসরত নেই: তৈরিতে ব্যস্ততা, লাভের খাতায় হতাশা

আপডেট সময় ১২:০৫:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র ৮ দিন বাকি। মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই ধর্মীয় উৎসবকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গা জেলার কামারপল্লীগুলোতে শুরু হয়েছে উৎসবমুখর কর্মব্যস্ততা। কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার জন্য প্রয়োজনীয় দা, ছুরি, চাপাতি ও বঁটির চাহিদা বাড়ায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে কামারদের অবিরাম পরিশ্রম। চারদিকে এখন শুধুই হাতুড়ি পেটানোর ‘ঠুং ঠাং’ শব্দ আর হাপরের বাতাস। কয়লার গনগনে আগুনে পোড়ানো লাল লোহা দক্ষ কারিগরের হাতের ছোঁয়ায় রূপ নিচ্ছে ধারালো অস্ত্রে।

​বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এই ঈদ মৌসুমটিই কামারদের জন্য সবচেয়ে ব্যস্ততম এবং উপার্জনের প্রধান সময়। তবে বিক্রি ও ব্যস্ততা বাড়লেও কাঁচামালের চড়া দাম এবং হাড়ভাঙা খাটুনির তুলনায় কাঙ্ক্ষিত লাভ না হওয়ায় কারিগরদের মুখের এই হাসি কেবলই সাময়িক।

হাট-বাজারে বেচাকেনার ধুম
​চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কামারশালাগুলোতে নতুন সরঞ্জাম তৈরির পাশাপাশি পুরোনো অস্ত্রে শান দেওয়ার ধুম পড়েছে। দোকানের সামনে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আকারের দা, ছুরি ও চাপাতি। আকার, ওজন ও লোহার মানভেদে এগুলোর দামেও রয়েছে ভিন্নতা।
​বাজারে বর্তমানে সরঞ্জামাদির দরদাম:
* ​সাধারণ ছুরি: ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা
* ​দা: ১,০০০ থেকে ১,২৫০ টাকা
* ​বঁটি: ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা
* ​পশু জবাইয়ের বড় ছুরি: ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা
* ​পুরোনো ছুরি শান দেওয়া: ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা (কাজের মানভেদে)
​অনেক ক্রেতাই ভিড় এড়াতে আগেভাগে পছন্দের সরঞ্জাম কিনছেন বা শান দিয়ে নিচ্ছেন। দামুড়হুদার ডুগডুগি বাজারে আসা ক্রেতা শরিফুল ইসলাম জানান, ঈদের বেশি দিন বাকি নেই বলে তিনি নতুন দা-ছুরি কিনতে এসেছেন। তবে অন্য বছরের তুলনায় এবার দাম কিছুটা চড়া। রাজু নামের আরেক ক্রেতার অভিযোগ, ঈদকে পুঁজি করে বিক্রেতারা কিছুটা বাড়তি দাম নিচ্ছেন।
​উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিতে কমছে লাভ

কার্পাসডাঙ্গা বাজারের কারিগর জিয়ারুল রহমান জানান, লোহা, কাঠের হাতল ও কয়লার দাম হু হু করে বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিক্রি বাড়লেও লভ্যাংশ আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। দিন-রাত কাজ করেও সময়মতো সব অর্ডার বুঝিয়ে দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
​আরেক কারিগর আলামিন হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সারাদিন তীব্র আগুনের পাশে বসে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়। এতে নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়, কিন্তু সেই তুলনায় আমাদের মজুরি অনেক কম।”
​সংকটে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্যবাহী লোহাশিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন চুয়াডাঙ্গার শত শত কামার পরিবার। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এর ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। কারিগর সুমন আলী জানান, কষ্ট বেশি কিন্তু আয় কম হওয়ায় নতুন প্রজন্মের তরুণরা এই পেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার পৈতৃক পেশা পরিবর্তন করছেন।

​স্থানীয় কারিগর ও সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে চুয়াডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী এই হস্তশিল্প আজ হুমকির মুখে। সরকার যদি আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ এবং স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতো, তবে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হতো। আসন্ন কোরবানির ঈদ চুয়াডাঙ্গার কামারদের মুখে সাময়িক হাসি ফুটিয়েছে সত্যি, তবে এই হাসিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ, আর্থিক প্রণোদনা ও দীর্ঘমেয়াদি