একজন মা।
দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করেছেন। নিজের ক্ষুধা, নিজের ঘুম, নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের মানুষ করেছেন। সন্তানের মুখে একবেলা খাবার তুলে দিতে নিজের প্রয়োজনকে বিসর্জন দিয়েছেন। সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে গিয়ে নিজের যৌবন, নিজের সুখ, নিজের জীবনটাকেই বিলিয়ে দিয়েছেন।
সেই মায়ের শেষ পরিণতি যদি হয় নিঃসঙ্গ মৃত্যু, আর মৃত্যুর পর দিনের পর দিন লাশ পড়ে থাকা|তাহলে প্রশ্ন শুধু একটি পরিবারের নয়, প্রশ্ন পুরো জাতির বিবেকের।
মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে নূর জাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়কে নাড়িয়ে দিয়েছে। খবর অনুযায়ী, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে তিনি মৃত অবস্থায় ফ্ল্যাটে পড়ে ছিলেন। এমনকি মরদেহে পচন ধরে যায়, পোকা জন্মায়। চারপাশের পরিবেশ হয়ে ওঠে মানুষের বসবাসের অযোগ্য।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হলো তিনি কোনো অসহায়, পথের ধারে পড়ে থাকা মানুষ ছিলেন না।
তার স্বামী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। কয়েক বছর আগে তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। জীবদ্দশায় তিনি শিক্ষা ও জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন।
আর তাদের সন্তানরাও সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানুষ।
খবর অনুযায়ী, একজন ছেলে যুগ্মসচিব, একজন বুয়েটের শিক্ষক, আরেকজন কানাডায় বসবাস করেন।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, তার মেয়ে একই ভবনের পাশের ফ্ল্যাটেই বসবাস করতেন বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
তারপরও যদি একজন মা দিনের পর দিন মৃত অবস্থায় পড়ে থাকেন, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই।
কোথায় ছিল সেই সন্তানেরা?কোথায় ছিল সেই দায়িত্ববোধ?কোথায় ছিল সেই ভালোবাসা, যার জন্য একজন মা সারাজীবন অপেক্ষা করেন?আমরা প্রায়ই বলি, সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করতে হবে।
কিন্তু আজ প্রশ্ন হলো আমরা কি শুধু শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছি, নাকি মানুষও তৈরি করছি?
একজন মানুষ যুগ্মসচিব হতে পারে।একজন মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারে।একজন মানুষ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।কিন্তু যদি সে নিজের মায়ের খোঁজ না রাখে, তাহলে সেই সাফল্যের মূল্য কতটুকু?একজন মা সন্তানের কাছে বিলাসিতা চান না।তিনি কোটি টাকার সম্পদ চান না।
তিনি শুধু জানতে চান “আমার সন্তান কি আমাকে মনে রেখেছে?” এই প্রশ্নের উত্তর যদি না হয়, তাহলে সব সাফল্যই ব্যর্থ।আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থনীতির নয়।
সবচেয়ে বড় সংকট মানবিকতার।আমরা ডিগ্রি অর্জন করছি, কিন্তু মূল্যবোধ হারাচ্ছি।আমরা পদমর্যাদা অর্জন করছি, কিন্তু দায়িত্ববোধ হারাচ্ছি।আমরা আধুনিক হচ্ছি, কিন্তু মা-বাবার প্রতি কর্তব্য ভুলে যাচ্ছি।
আর শুধু সন্তানদের দিকে আঙুল তুললেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।প্রতিবেশীরা কোথায় ছিলেন?আত্মীয়রা কোথায় ছিলেন?সমাজ কোথায় ছিল?একজন মানুষ মৃত্যুর পর সাত দিন পড়ে থাকেন, অথচ কেউ খোঁজ নেয় না—এটিও আমাদের সামাজিক ব্যর্থতা।নূর জাহান বেগমের মরদেহ আজ একটি লাশ নয়, একটি প্রশ্ন।এই প্রশ্ন সন্তানদের প্রতি।এই প্রশ্ন সমাজের প্রতি।এই প্রশ্ন রাষ্ট্রের প্রতি।আর সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রশ্ন আমাদের প্রত্যেকের বিবেকের প্রতি।কারণ মায়ের মরদেহে পোকা ধরার আগে পোকা ধরেছে আমাদের মানবিকতায়।পচন ধরেছে আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধে।আর যে সমাজে মায়ের চেয়ে পদমর্যাদা বড় হয়ে যায়, সেই সমাজ কখনো সভ্য সমাজ হতে পারে না।নূর জাহান বেগমের নিঃসঙ্গ মৃত্যু হয়তো একটি ঘটনা।কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে পুরো সমাজের নৈতিক পতনের নির্মম প্রতিচ্ছবি।আজ তাই প্রশ্ন একটাই আমরা কি সত্যিই মানুষ তৈরি করছি?নাকি শুধু পদবিধারী মানুষ তৈরি করছি?

এ কে এম ফখরুল আলম(বাপ্পী চৌধুরী) 




















