কোরবানির ঈদের আর মাত্র চার দিন বাকি। কিন্তু সিলেটের চার জেলায় ফসল হারা মানুষের মনে ঈদের আনন্দ নেই। তারা এখন আগামী এক বছরের খোরাকিসহ সংসারের যাবতীয় খরচ নির্বাহের চিন্তায় অস্থির। এবার বহু কৃষক এক গোটা ধানও গোলায় তুলতে পারেননি। সুখী গৃহস্থরা পর্যন্ত এবার বিপাকে। সরকারি হিসাবে সিলেটের চার জেলায় ১ লাখ ৭০ হাজার কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রতি পরিবারে পাঁচ জন করে সদস্য ধরা হলে সাড়ে ৮ লাখ লোক এখন অসহায় দিন কাটাচ্ছেন। তাদের ঘরে খাওয়া নেই। তাই নিরুপায় অনেক কৃষক ডুব সাঁতার দিয়ে পচা ধান তুলছেন।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ঘোষিত সরকারি সহায়তা এখনো মঞ্জুর হয়নি। ঈদের আগে এই সহায়তা পাবেন বলে আশা করছিলেন কৃষকেরা। কিন্তু তা এখনি পাওয়া যাচ্ছে না বলে সূত্র আভাষ দিয়েছে। প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, জনপ্রতিনিধি সমন্বিতভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে যথা সময়ে ঊর্ধ্বতন মহলে পাঠানো হয়। কিন্তু তা এখনো অনুমোদন হয়নি।
ডুব সাঁতার দিয়ে পচা ধান তুলছেন নিরুপায় কৃষকেরা: অন্যদিকে বিভিন্ন হাওরপাড়ের মানুষ এখনো নিরুপায় হয়ে পচা ধান এবং গোখাদ্যের খড় শুকাচ্ছেন। নিঃস্ব কৃষকেরা ডুব সাঁতার দিয়ে নিড়ানি দিয়ে ধান গাছ উপড়ে আনছেন। এমন দৃশ্য সুনামগঞ্জের শাল্লা, দিরাই, ধর্মপাশা, মধ্যনগর, সুনামগঞ্জ সদর, দোয়াবাজার, জামালগঞ্জ, তাহিরপুরসহ বিভিন্ন উপজেলার বড় হাওরগুলোতে দেখা যায়। পঁচা ধান ভাঙ্গিয়ে চাউল খাওয়া কত টুকু স্বাস্থ্যসম্মত তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
১ লাখ ৭০ হাজার ১৫২ জন কৃষক জলাবদ্ধতাসহ নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত: এবার বৃহত্তর সিলেটে ১ লাখ ৭০ হাজার ১৫২ জন কৃষক জলাবদ্ধতাসহ নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় সুনামগঞ্জে। সেখানে ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৬৯ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সিলেট বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানায়, এবার সিলেটের চার জেলায় ৪ লাখ ৯৮ হাজার ১১৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়। এর মধ্যে জলাবদ্ধতাসহ নানা দুর্যোগে ৪ লাখ ৫৯ হাজার ৪৩৫ হেক্টর বোরো জমি কর্তন হয়। এতে ১৮ লাখ ৮৯ হাজার ২৫১ মে.টন চাল পেয়েছেন কৃষকেরা। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জ জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টরে বোরো চাষ হলে ২ লাখ ২ হাজার ৭০০ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্ভব হয়। এ থেকে ৮ লাখ ৪১ হাজার ৫৭৯ মে.টন চাল পেয়েছেন কৃষকেরা। যদিও হাওরপাড়ের মানুষেরা বলেছেন, ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। চার জেলায় টাকার অংকে বোরোর ক্ষতি ৯৯৭ কোটি ৮২ লক্ষ ৮২ হাজার ২০১ টাকা।
স্থানীয় কৃষক ও হাওর সংগঠনের একাধিক নেতৃবৃন্দ বলেন, কৃষি অফিস শুধু তলিয়ে যাওয়া ধানের ক্ষতি হিসাব খাতায় অন্তর্ভুক্তি করেছে। কিন্তু অনেক কৃষকের ধান কাটার পরেও রোদ না থাকায় ধানে চারা গজিয়েছে, পচে গিয়ে সেসব ধান একেবারেই নষ্ট হয়ে গিয়েছে—সেই ধান পরবর্তীতে পানিতে ফেলে দিতে হয়েছে। তাছাড়া হাওরের কৃষকদের গৃহপালিত পশুর একমাত্র খাদ্য খড়ও পানিতে ভেসে গিয়েছে। এগুলোর হিসাব সরকারি দপ্তরে নেই। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, সংসারের বাজার-সদাইয়ের খরচসহ যাবতীয় খরচ চালানো হয় এই ফসল থেকে। কিন্তু এখন কৃষকদের ঘরে ঘরে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

ডিজিটাল রির্পোট 

















