জনগণের আমানতের টাকায় পরিচালিত দেশের ব্যাংকিং খাত যখন খেলাপি ঋণ, পুনঃতফসিল আর নানামুখী আর্থিক অনিয়মের চরম সংকটে জর্জরিত, ঠিক তখনই সামনে এলো এক বিস্ফোরক ও চাঞ্চল্যকর তথ্য। বর্তমান সংসদ সদস্যদের (এমপি) কাছেই দেশের ব্যাংকগুলোর পাওনার পরিমাণ নাকি প্রায় ১১ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকা!
সংসদ অধিবেশনে এই গুরুতর তথ্যটি উত্থাপন করতে গিয়েই স্পিকারের তোপের মুখে পড়েছিলেন সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা,মাঝপথেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল তাঁর মাইক। এই ঘটনা দেশের সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অসংখ্য অনুত্তরিত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে,যদি এই তথ্যটি সত্যিই সংসদে উত্থাপিত হয়ে থাকে, তবে আইনপ্রণেতাদের এই বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে এত ভয় কেন? কেনই বা আমজনতার সর্বোচ্চ ফোরামে এসে প্রশ্ন তোলার অধিকারকে এভাবে টুঁটি চেপে বন্ধ করতে হলো?
এখানে একটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন মানেই তিনি অপরাধী বা ঋণখেলাপি এমনটি ভাবা ভুল। ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে নিয়ম মেনে ঋণ নেওয়া একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও বৈধ প্রক্রিয়া। যদি সংসদ সদস্যরা নিয়ম মেনে ঋণ নিয়ে থাকেন এবং তা নিয়মিত পরিশোধ করে যান, তবে তাতে কোনো আইনি বাধা নেই।
কিন্তু মূল প্রশ্ন ও আপত্তির জায়গাটি অন্য কোথাও। প্রশ্ন হলো, এই বিশাল অঙ্কের ঋণের বর্তমান অবস্থা কী? সাধারণ গ্রাহকরা যেখানে সামান্য ঋণের জন্য ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও জুতো ক্ষয় করেন, সেখানে এই ভিআইপি ঋণগ্রহীতাদের কি কোনো বিশেষ সুবিধা বা অনৈতিক ছাড় (যেমন নামমাত্র মূল্যে পুনঃতফসিল বা সুদের হার মওকুফ) দেওয়া হয়েছে? পুরো ঋণ প্রক্রিয়ায় এবং তা আদায়ের ক্ষেত্রে কি শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর লুকিয়ে রাখার চেষ্টাটাই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে।
দেশের ব্যাংকগুলো কোনো ব্যক্তিগত তহবিল নয়, এগুলো আমজনতার হাড়ভাঙা খাটুনির আমানতে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। তাই জনগণের টাকায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সেই ব্যাংকের কত হাজার কোটি টাকা ব্যবহার করছেন, তা জানার পূর্ণ অধিকার এই দেশের সাধারণ মানুষের রয়েছে।
জনগণ আজ জানতে চায়,কারা সেই প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতা এমপি? তাদের ঋণগুলো নিয়মিত পরিশোধ হচ্ছে কি না? নাকি সাধারণ কৃষকের ১০ হাজার টাকার কৃষি ঋণের জন্য কোমরে দড়ি পড়ে, আর হাজার কোটি টাকার ক্ষমতাশালী গ্রহীতাদের বেলায় আইন তার নিজের গতি হারিয়ে ফেলে? সবার জন্য কি এই রাষ্ট্রে একই আইন প্রযোজ্য হবে না?
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সংসদ হলো জনগণের পক্ষে প্রশ্ন তোলার এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পবিত্রতম স্থান। সেখানে কোনো বিতর্কিত বা সংবেদনশীল তথ্য সামনে এলে সেটির যৌক্তিক ব্যাখ্যা, সঠিক যাচাই এবং খোলামেলা আলোচনা হওয়াই সুস্থ সংসদীয় চর্চার লক্ষণ। সত্য যদি সত্যিই নিষ্কলঙ্ক হয়, তবে মাইক বন্ধ করে তথ্য চেপে রাখার এই সস্তা ও আক্রমণাত্মক চেষ্টা কেন?
জনগণের অর্থ, জনগণের প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চলা প্রতিনিধিদের বিষয়ে শেষ কথা বলার এবং সত্য জানার চূড়ান্ত অধিকার এ দেশের মালিক তথা জনগণেরই রয়েছে। তথ্যের এই অস্পষ্টতা ও চেপে রাখার সংস্কৃতি বন্ধ হোক। অবিলম্বে এই বিশাল অঙ্কের ঋণের প্রকৃত খতিয়ান ও শ্বেতপত্র জনগণের সামনে প্রকাশ করা হোক। কারণ, স্বচ্ছ আলোচনা ও জবাবদিহি ছাড়া কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য।

এ কে এম ফখরুল আলম(বাপ্পী চৌধুরী) 























