সন্ধ্যা নামার পর শেরপুরের গারো পাহাড়ের পাদদেশের গ্রামগুলোর চিত্র বদলে যায়। দিনের ব্যস্ততা শেষে মানুষ ঘরে ফিরলেও অনেকের চোখ থাকে পাহাড়ের দিকে। ধানখেতের পাশ দিয়ে অচেনা কোনো শব্দ ভেসে এলে বাড়ে উৎকণ্ঠা—পাহাড় থেকে হাতির পাল নামল কি না।
হাতির পাল লোকালয়ে নামলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে কৃষকের কয়েক মাসের শ্রম। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসল। কখনো ঘটছে প্রাণহানিও। ফলে গারো পাহাড়ের পাদদেশের মানুষের কাছে বন্যহাতি এখন শুধু বন্যপ্রাণী নয়, রাতের নিরাপত্তা ও জীবিকার সঙ্গেও জড়িয়ে থাকা এক বাস্তবতা।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় মানুষ ও বন্যহাতির এই সংঘাত দীর্ঘদিনের। বনভূমি সংকুচিত হওয়া, পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে মানুষের বসতি ও কৃষিকাজের বিস্তার এবং হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে বলে বন বিভাগ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
১৬ বছরে ৪৬ মানুষের মৃত্যু
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত শেরপুরের পাহাড়ি জনপদে মানুষ ও হাতির সংঘাতে ৪৬ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন কারণে ৩৪টি বন্যহাতিও মারা গেছে।
এই পরিসংখ্যান সংঘাতের দুই দিকই সামনে আনে। হাতির আক্রমণে যেমন মানুষের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি মানুষের তৈরি ফাঁদ, বৈদ্যুতিক তারসহ নানা কারণে প্রাণ হারাচ্ছে হাতিও।
চলতি বছরের মে মাসে নালিতাবাড়ীর নাকুগাঁও এলাকায় ধানখেত ঘিরে প্রায় এক কিলোমিটার বৈদ্যুতিক তারের ফাঁদ পাতার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। সেই ফাঁদে একটি হাতি আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। বন বিভাগ ফাঁদ সরাতে গেলে স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়ার কথা জানানো হয়েছিল।
ফসল রক্ষার জন্য কৃষকের উদ্বেগ বাস্তব। কিন্তু এ ধরনের বৈদ্যুতিক ফাঁদ মানুষ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্যও প্রাণঘাতী। ফলে ফসল রক্ষার তাৎক্ষণিক চেষ্টা শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ধানখেতই কেন হাতির গন্তব্য
গারো পাহাড়ে বন্যহাতির বিচরণ বাড়ছে। চলতি বছরও শেরপুরের পাহাড়ি এলাকায় শাবকসহ হাতির পাল দেখা গেছে। নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতির পাহাড়ি বনাঞ্চলজুড়ে হাতির নিয়মিত চলাচলের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হাতি খাবার ও পানির সন্ধানে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যায়। বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত খাবার ও পানির উৎস না থাকলে তারা লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসে। পাহাড়ের পাদদেশে থাকা ধানখেত, কাঁঠালসহ বিভিন্ন কৃষিজ ফসল তখন হাতির সহজ খাদ্য হয়ে ওঠে।
গারো পাহাড়ের হাতির চলাচলের সঙ্গে ভারতের মেঘালয় অঞ্চলেরও যোগাযোগ রয়েছে। ফলে হাতির বিচরণ মানুষের তৈরি সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি হাতির পাল তার স্বাভাবিক চলাচলের পথ ধরে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যায়। সেই পথের কোথাও যদি বসতি, চাষাবাদ কিংবা অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়, তখনই মানুষের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে।
হাতির পথ সংকুচিত হলে সংঘাত বাড়ে
বন্যহাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো নিরাপদ আবাসস্থল ও চলাচলের পথ। কিন্তু গারো পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় বনভূমি সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের বসতি ও কৃষিকাজ বেড়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই হাতির আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ফলে হাতির সামনে প্রশ্ন থাকে না—এ পথ মানুষের, না বনের। খাবার ও নিরাপদ চলাচলের প্রয়োজনেই তারা এগিয়ে যায়। আর সেই চলাচল যদি মানুষের বসতি বা ফসলের জমির মধ্য দিয়ে হয়, তখন সংঘাত প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে।
এই বাস্তবতায় শুধু হাতি তাড়ানোর উদ্যোগ দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বরং হাতির চলাচলের পথ চিহ্নিত করে তা সুরক্ষিত রাখা, বনাঞ্চলে খাবার ও পানির উৎস বাড়ানো এবং লোকালয়ে হাতি ঢোকার আগেই মানুষকে সতর্ক করার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
কৃষকের ফসল, হাতির জীবন
সীমান্তের কৃষকের কাছে একটি ধানের খেত কয়েক মাসের শ্রম ও বিনিয়োগের ফল। হাতির পাল মাঠে নামলে সেই ফসল রক্ষা করতে গিয়ে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতির আশ্রয় নেন। বৈদ্যুতিক ফাঁদ তার সবচেয়ে ভয়ংকর উদাহরণ।
অন্যদিকে, হাতির জন্যও লোকালয় নিরাপদ নয়। মানুষের ভিড়, আলো, শব্দ ও তাড়ানোর চেষ্টায় হাতি আতঙ্কিত হয়ে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। এ সময় মানুষ ও হাতি—দুই পক্ষেরই ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ে।
তাই হাতিকে শুধু ‘উপদ্রব’ হিসেবে দেখলে সমস্যার একটি অংশই দেখা হয়। আবার মানুষের নিরাপত্তা ও ফসলের ক্ষতিকে উপেক্ষা করেও হাতি সংরক্ষণ সম্ভব নয়। সমাধান খুঁজতে হলে দুই পক্ষের নিরাপত্তাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
রয়েছে উদ্যোগ, প্রশ্ন স্থায়ী সমাধান নিয়ে
হাতি-মানুষের সংঘাত কমাতে বন বিভাগ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় মানুষকে সতর্ক করা, এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের মাধ্যমে হাতিকে নিরাপদে বনে ফেরানোর চেষ্টা এবং হাতির আবাসস্থলে খাদ্য উপযোগী গাছ লাগানোর মতো উদ্যোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সোলার ফেন্সিং ও অন্যান্য প্রতিরোধব্যবস্থার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে হাতির আবাস ও চলাচলের পথ রক্ষা করা। কারণ হাতির চলাচলের পথ যদি ক্রমেই সংকুচিত হয়, তাহলে কোনো একটি এলাকায় ফেন্সিং বা হাতি তাড়ানোর ব্যবস্থা করেও দীর্ঘমেয়াদে সংঘাত বন্ধ করা কঠিন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থাও রয়েছে। ২০২৫ সালে শেরপুরে হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত ১৫ জন কৃষকের মধ্যে প্রায় চার লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণের তথ্যও পাওয়া যায়।
তবে ক্ষতিপূরণ যেন দ্রুত ও সহজ প্রক্রিয়ায় পাওয়া যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতি হওয়ার পর কৃষক যদি দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেন, তাহলে হাতি ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে।
সীমান্তপারের সমন্বয়ও জরুরি
গারো পাহাড়ের বন্যহাতির বিচরণ বাংলাদেশের সীমান্তে এসে থেমে যায় না। ভারতের মেঘালয় অঞ্চলের সঙ্গে এই হাতির চলাচলের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে শুধু একটি দেশের ভেতরে বিচ্ছিন্নভাবে উদ্যোগ নিয়ে এই সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করা কঠিন।
হাতির চলাচলের পথ মানুষের তৈরি সীমারেখা মানে না। তাই সীমান্তবর্তী বনাঞ্চল, হাতির চলাচলের করিডর ও আবাসস্থল বিবেচনায় নিয়ে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মানুষ ও হাতি—দুইয়ের জন্যই নিরাপদ পথ
ময়মনসিংহের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নূরুল করিম বলেন, শেরপুরের গারো পাহাড়ে শতাধিক বন্যহাতির বিচরণ রয়েছে। এসব হাতিকে রক্ষা করার পাশাপাশি মানুষকেও নিরাপদ রাখতে হবে। হাতি-মানুষের সংঘাত কমাতে হাতির আবাস ও বিচরণস্থল নিশ্চিত করার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত পদ্ধতিতে কাজ করা হচ্ছে। হাতির স্বাভাবিক চলাচলে বাধা না দেওয়া এবং হাতিকে বিরক্ত না করার বিষয়ে স্থানীয় মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। হাতির কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রয়েছে।
গারো পাহাড়ের বাস্তবতা হলো—পাহাড়ের পাদদেশে মানুষের বসতি ও কৃষিজমি থাকবে, একই সঙ্গে পাহাড়ে বন্যহাতির বিচরণও থাকবে। তাই মানুষকে সরিয়ে কিংবা হাতিকে তাড়িয়ে এক পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চিন্তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়।
প্রয়োজন হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ চিহ্নিত ও সুরক্ষিত করা, বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত খাবার ও পানির ব্যবস্থা রাখা, লোকালয়ে হাতি আসার আগেই মানুষকে সতর্ক করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ক্ষতিপূরণ দ্রুত নিশ্চিত করা।
তাহলেই হয়তো গারো পাহাড়ের পাদদেশে এমন এক সময় আসবে, যখন রাত নামলে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে মানুষ হাতির আতঙ্কে নয়, নিজের ফসল ও পরিবারের নিরাপত্তার নিশ্চয়তায় ঘরে ফিরতে পারবেন।
পাহাড়ে হাতি থাকবে, পাহাড়ের পাদদেশে মানুষও থাকবে—প্রয়োজন শুধু দুয়ের মাঝখানে একটি নিরাপদ সহাবস্থানের পথ তৈরি করা।

তাওহিদুজ্জামান রোমান, শেরপুর জেলা প্রতিনিধি 


















