দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারের পক্ষ থেকে চলতি জুন মাসের মধ্যেই নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বেতন গ্রেড, পেনশন সুবিধা এবং ভাতার কাঠামোয় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে, যা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকেই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। এ জন্য আসন্ন জাতীয় বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ একযোগে বাস্তবায়ন করতে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বেতন কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব
প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে-স্কেলে বর্তমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হলেও বেতনের পরিমাণে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে নিম্ন ও উচ্চ—উভয় পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন পে-স্কেল একবারে কার্যকর না করে তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
* প্রথম ধাপ: আগামী ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি কার্যকর হতে পারে।
* পরবর্তী ধাপ: পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে বাকি অংশ সমন্বয় করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা এবং সরকারি ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় নিয়েই এই কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
পেনশনভোগীদের জন্যও সুখবর
নতুন পে-স্কেলের আওতায় দেশের প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীকেও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী বর্তমানে তুলনামূলক কম পেনশন পাচ্ছেন, তাদের সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে পেনশন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুযোগ রাখা হতে পারে। ফলে বিপুলসংখ্যক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী সরাসরি উপকৃত হবেন।
এক ধাপে বাস্তবায়নের দাবি কর্মচারী সংগঠনগুলোর
তবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের এই পরিকল্পনায় সন্তুষ্ট নন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশ। বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠনের নেতারা বলছেন, বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধি বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের দাবি, নতুন পে-স্কেল এক ধাপেই সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে এবং শতভাগ বেতন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনা না হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
অর্থনীতিতে প্রভাব
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারি চাকরিজীবী ও পেনশনভোগীদের আয় বাড়বে, যা বাজারে ভোগব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে এর পাশাপাশি সরকারের আর্থিক ব্যয়ভার ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর বড় ধরনের অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

স্টাফ রিপোর্টার 



















