ব্যক্তি টিটু একজন অসাধারণ, বিনয়ী, নিরহংকারী, ও পরিচ্ছন্ন মানুষ। আজকের সময়ে যেখানে অনেক ক্ষমতাবান মানুষের নামের সঙ্গে অহংকার, বিলাসিতা কিংবা নানা বদ অভ্যাসের অভিযোগ জড়িয়ে যায়, সেখানে ব্যক্তি টিটু সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উদাহরণ। পুরুষের মধ্যে যে সব বদ অভ্যাসকে সমাজ প্রায় স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছে, সেগুলোর কোনোটিই তার ব্যক্তিগত জীবনে খুঁজে পাওয়া যায় না।
অপরদিকে, মেয়র টিটু অদক্ষ, অদূরদর্শিতা ও অযোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে গেছে তার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে। এ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই উন্নয়নমূলক একটি কাজও করতে পারেনি। এমন কোনো প্রকল্প চোখে পড়ে না, যা আগামী ২০ বা ৩০ বছর পরও এই শহরের উন্নয়নের মাইলফলক হিসেবে মানুষ স্মরণ করবে। একটি শহর পরিচালনা শুধু ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, একটি শহরকে বাসযোগ্য, পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত ও ভবিষ্যতমুখী করে গড়ে তোলাই একজন সফল মেয়রের প্রকৃত পরিচয়।
দীর্ঘ ১৫ বছর সাবেক পৌরসভা ও বর্তমান সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বে থাকাকালীন সময় যে পরিমাণ বাজেট তার হাত দিয়ে ব্যয় হয়েছে, একজন যোগ্য, পরিপক্ব ও দক্ষ লোক এই নগরের দায়িত্বে থাকলে আজ বিশ্বের নবম অপরিচ্ছন্ন, অপরিকল্পিত, নোংরা ও জলাবদ্ধ নগর হিসেবে পরিচিতি পেতো না। বরং এই শহর হতে পারত উন্নত ড্রেনেজ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রশস্ত সড়ক, পরিকল্পিত ফুটপাত, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত পার্ক এবং পরিবেশবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনার একটি উদাহরণ। একটি শহরের উন্নয়ন শুধু নিয়ম বহির্ভূত বহুতল ভবন, ইট-পাথরের কাজ দিয়ে বিচার করা যায় না, বিচার করতে হয় নাগরিকরা কতটা স্বস্তিতে বসবাস করছে, কত দ্রুত সেবা পাচ্ছে এবং বর্ষাকালে তাদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে কি না।
নগরবাসীর একটি বড় প্রত্যাশা ছিল দীর্ঘ সময় একই নেতৃত্ব থাকলে অন্তত একটি সুদূরপ্রসারী মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু বাস্তবে আজও নাগরিকদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত সড়ক, খোঁড়াখুঁড়ি এবং অপর্যাপ্ত নাগরিক সেবা। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সুফল সাধারণ মানুষ প্রতিদিন অনুভব করতে পারে।
সিটি কর্পোরেশনের মূল কাজ হল ড্রেনেজ ব্যবস্থা। এ যাবৎ যত ড্রেন করেছে, শুধু খরচ ও বিল-ভাউচার পূরণ করার জন্য। একই কাজ বারবার করেছে। বর্ষা এলেই শহরের সকল এলাকায় পানি জমে যায়, সড়ক ডুবে যায়, দুর্ভোগে পড়তে হয় মানুষকে। যদি একটি ড্রেন নির্মাণের পরও প্রতি বছর একই সমস্যা ফিরে আসে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে , সমস্যা কোথায়? পরিকল্পনায়, নকশায়, নাকি বাস্তবায়নে? জনগণের করের টাকায় পরিচালিত প্রতিটি প্রকল্পের জবাবদিহিতা থাকা জরুরি। কারণ সরকারি অর্থ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়,এটি জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ।
উন্নয়ন মানে শুধু কাজের উদ্বোধন নয়, কাজের স্থায়িত্বও। যে উন্নয়ন পাঁচ বছর টেকে না, সেটিকে টেকসই উন্নয়ন বলা যায় না। তাই প্রকল্পের সংখ্যা নয়, প্রকল্পের গুণগত মানই হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান বিষয়।একজন জনপ্রতিনিধি এক দায়িত্বে ১৫ বছর, বাজেট সীমাহীন তারপরও ময়মনসিংহ নগরে জলাবদ্ধতা কেন? এই প্রশ্ন নগরবাসীর।
টিটু থেকে রোকন,
রোকনের কথা বলতে গেলে তার দায়িত্বের অল্প কদিন। সময় অনুযায়ী এই ভয়াবহ জলাবদ্ধতার দায় এক ফুটাও রোকনের উপর বর্তায় না। কারণ দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি সমস্যার সমাধান কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসে করা সম্ভব নয়। প্রশাসনিক বাস্তবতা সেটিই বলে। একটি শহরের অবকাঠামোগত সংকট দূর করতে পরিকল্পনা, অর্থায়ন, প্রকল্প অনুমোদন এবং দীর্ঘদিনের অগোছানো শহরকে গোছাতে একটু সময়ের প্রয়োজন। সেই সময় অতিবাহিত হওয়ার পরে রোকনের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা আসতে পারে। তখন মানুষ তার প্রতিশ্রুতি ও বাস্তব কাজের তুলনা করবে। তিনি কী বলেছিলেন, আর কী করেছেন সেই হিসাবই হবে সবচেয়ে বড় মূল্যায়ন।
তবে তার লক্ষণ দেখে বোঝা যাচ্ছে, সে ভালো কিছু করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। মাঠে উপস্থিতি, নাগরিক সমস্যার খোঁজ নেওয়া, দ্রুত কিছু উদ্যোগ গ্রহণ এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এসব বিষয় ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। তবে চেষ্টা যতই আন্তরিক হোক, শেষ পর্যন্ত জনগণ ফলাফলই দেখতে চায়। কারণ নাগরিকদের জীবনে পরিবর্তন আনতে না পারলে শুধু সদিচ্ছা দিয়ে ইতিহাস লেখা যায় না।
এই চেষ্টা কি সামনে মেয়র নির্বাচন করার অভিনব কৌশল নাকি বাস্তব? এই প্রশ্ন অনেকের মনেই রয়েছে। রাজনীতিতে জনসংযোগ বাড়ানোর জন্য অনেক সময় দৃশ্যমান তৎপরতা দেখা যায়। আবার এমনও হয়, ক্ষমতার বাইরে থেকেও কেউ আন্তরিকভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে একজন সফল জনপ্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। তাই এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। সময়ই প্রমাণ করবে এটি রাজনৈতিক কৌশল, নাকি সত্যিকারের জনসেবার মানসিকতা।
নিন্দুকেরা মনে করছে, অনেক সময় অভিনয় করতে করতে তাহা সত্যিতে পরিণত হয়। যেমন নায়করাজ রাজ্জাক বলেছিল, “তোর সাথে বাবার অভিনয় করতে করতে আমি সত্যিই বাবা হয়ে গেছি রে।” ঠিক তেমনি রোকন সেবকের অভিনয় করতে করতে সত্যিই সেবক হয়ে যেতে পারে। যদি এই শহরের মানুষের সুখ-দুঃখকে নিজের দায়িত্ব মনে করে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন, তাহলে অভিনয় আর বাস্তবতার পার্থক্য একসময় মুছে যাবে। তখন মানুষ তাকে কথায় নয়, কাজেই মূল্যায়ন করবে।
দেখা যাক আগামীতে এই নগরীর দায়িত্বে কাকে বেছে নেয় নগরবাসী রোকন, নাকি অন্য কেউ? নগরবাসী শুধু ব্যক্তি বা দল দেখে নয়, কাজ, পরিকল্পনা, সততা, দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ নগর গড়ার সক্ষমতা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে। একটি সঠিক নেতৃত্ব একটি শহরের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। তাই আগামী দিনের সিদ্ধান্ত হবে আবেগ নয়, বাস্তব কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে।

এ কে এম ফখরুল আলম(বাপ্পী চৌধুরী) 























