মাত্র নয় মাস বয়সে মাথার ওপর থেকে সরে গিয়েছিল বাবার ছায়া। মাথা গোঁজার নিজস্ব কোনো ঠাঁই ছিল না। মা গ্রামে গ্রামে ঘুরে মুড়ি আর কলা বিক্রি করে যে সামান্য টাকা পেতেন, তা দিয়েই চলত মা-ছেলের সংসার। অভাবের তাড়নায় পূর্বধলা উপজেলার বুধী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই হাতে তুলে নিতে হয়েছিল কাঠমিস্ত্রীর হাতুড়ি-বাটাল। সেই থেকে দীর্ঘ ৩০টি বছর দিনমজুর হিসেবেই কেটেছে জীবন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে এক সড়ক দুর্ঘটনায় হাত-পা ভেঙে যায় তার। এর পর থেকেই জীবনে নেমে আসে চরম কষ্ট। এখনো ডান হাতে প্লেট ভরা রয়েছে, তবুও হাল ছাড়েননি তিনি।
গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার উত্তর পূর্বধলা গ্রামের হারাধন সূত্রধরের (আরাধন) অভিধানে ‘হার মেনে নেওয়া’ শব্দটা ছিল না। তীব্র শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর চরম দারিদ্র্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি সম্পন্ন করেছেন বি.এ. (স্নাতক) ডিগ্রি। আজ তিনি শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, তিনি বিগত এক দশক ধরে এলাকার শত শত অসহায় গরীব ও প্রতিবন্ধী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে হয়ে উঠেছেন এক মানবতার ফেরিওয়ালা।
নিঃস্বার্থ সমাজসেবা ও এলাকার মানুষের কল্যাণে দিনরাত কাজ করতে গিয়ে জীবনের ৪১টি বসন্ত পেরিয়ে গেলেও এখনও তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি। নিজের কোনো সংসার গড়ে না তুললেও, এলাকার প্রতিটি অসহায় মানুষকেই তিনি নিজের পরিবার মনে করেন। এবার ৬নং পূর্বধলা সদর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের সর্বস্তরের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সেবার উদ্দেশ্যে আসন্ন নির্বাচনে মেম্বার (ইউপি সদস্য) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন অদম্য এই সমাজসেবক।
মায়ের দোয়া ও অশ্রুসিক্ত অতীত
হারাধনের এই নির্বাচনি যাত্রার পেছনে রয়েছে এক আবেগঘন অধ্যায়। ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে লড়ার জন্য মায়ের কাছ থেকে অনুমতি ও দোয়া নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সোনালী ব্যাংকে অন্যের সিসি লোনের জামিনদার হওয়ায় ঋণখেলাপির আইনি জটিলতায় সেবার তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়। মায়ের অনুমতি পেয়েও নির্বাচনে অংশ নিতে না পারার সেই বেদনায় কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন হারাধন। মায়ের চোখেও সেদিন ঝরেছিল বুকফাটা জল। সেই কান্নার ঋণ শোধ করতে এবং মায়ের মুখখানা একটু হাসিতে ভরিয়ে দিতেই এবার তিনি মেম্বার পদে লড়াইয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
কষ্টের পাথর কেটে সাফল্যের আলো
স্থানীয়রা জানান, স্বর্গীয় উপেন্দ্র চন্দ্র সূত্রধর ও ঊষা রানী সূত্রধরের সন্তান হারাধনের শৈশব কেটেছে অন্যের বাড়িতে আশ্রিত হিসেবে। পূর্বধলা উপজেলার বুধী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই শুরু হয় তার কঠোর শ্রমের জীবন। তবে শত কষ্টের মাঝেও পড়াশোনার প্রতি তার যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল, বিএ পাস করার মাধ্যমে তারই প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও সামাজিক কার্যক্রমের সাথেও যুক্ত রয়েছেন।
মানবতার সেবায় এক দশক
ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্টকে একপাশে সরিয়ে রেখে ২০১৭ সাল থেকে নিজের গড়া একটি সমিতির মাধ্যমে এলাকার অসহায়, গরিব, দুস্থ ও প্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন হারাধন। গত কয়েক বছর ধরে নিয়মিতভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহযোগিতা এবং ত্রাণ সামগ্রী কম্বল বিতরণ করে আসছেন তিনি। সামাজিক কাজের পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নেও রয়েছে তার নিরবচ্ছিন্ন অবদান।
মতবিনিময় সভায় ভোটারদের উচ্ছ্বাস
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১২,জুন শুক্রবার সকালে ১নং ওয়ার্ডের সাধারণ ভোটারদের সাথে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। উক্ত সভায় হারাধন সূত্রধর (আরাধন) যখন আনুষ্ঠানিকভাবে তার মেম্বার পদে লড়ার ঘোষণা দেন, তখন উপস্থিত সাধারণ ভোটারদের মাঝে ব্যাপক আনন্দ ও উচ্ছ্বাস দেখা যায়। এলাকার সাধারণ মানুষ তার এই সাহসী ও সেবামূলক সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে অত্যন্ত খুশি মনে তাকে পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দেন।
সেবার লক্ষ্য এক ও অবিচল
জানতে চাইলে এক বুক প্রত্যয় নিয়ে হারাধন সূত্রধর (আরাধন) বলেন,
”শৈশব থেকে দারিদ্র্য ও কষ্ট কী জিনিস তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। আমি নিজের জন্য বাঁচি না, আমি জনগণের। গত ২০২৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে মায়ের দোয়া নিয়ে ভাইস চেয়ারম্যান পদে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অন্যের ঋণের জামিনদার হওয়ায় আইনি জটিলতায় তা পারিনি। সেদিন মায়ের সামনে নিজের কান্না ধরে রাখতে পারিনি, মা-ও কেঁদেছিলেন। এবার মায়ের মুখের হাসি ফোটাতে এবং জনগণের ভালোবাসার টানে আমি আমার নিজের ইউনিয়ন, অর্থাৎ ৬নং পূর্বধলা সদর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের মেম্বার পদে লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “উপরে মহান সৃষ্টিকর্তা আর পাশে আমার এলাকার সাধারণ মানুষ থাকলে আমার কোনো ভয় নেই। জয়-পরাজয় বড় কথা নয়, আমৃত্যু মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও পূর্বধলার উন্নয়নে নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাই।”
এলাকার সুশীল সমাজ ও সাধারণ ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, একজন সৎ, উচ্চশিক্ষিত, কর্মঠ এবং দুঃখী মানুষের আপনজন হিসেবে হারাধন সূত্রধর ইতিমধ্যে এলাকায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। একজন সাবেক দিনমজুর ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করা মানুষ যখন সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামেন, তখন তা পুরো জনপদের মানুষকে অনুপ্রাণিত করে।

সাগর আহমেদ জজ:পূর্বধলা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি 

















