চিফ হুইপের বক্তব্য সংবিধান লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক প্রতারণা—আলোচনা সভায় বক্তারা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ওপর সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতা আরোপ করাকে সংবিধান লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে প্রতারণা বলে মন্তব্য করেছে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।
গত সোমবার (১৭ আগস্ট) সকাল ১১টায় রাজধানীর তোপখানা রোডে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ৭০ অনুচ্ছেদের ভূমিকা’ শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনা সভায় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এসব কথা বলেন।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রখ্যাত গীতিকবি ও রাষ্ট্রচিন্তক শহীদুল্লাহ ফরায়জী। তিনি বলেন, সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হলেও এটি সংসদের কোনো অধিবেশন বা সংসদীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন মূলত নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত একটি স্বতন্ত্র নির্বাচন।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়নের সময় তাঁদের সংসদীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সময় তারা সংবিধান নির্ধারিত নির্বাচকমণ্ডলীর (Electoral College) সদস্য হিসেবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রদত্ত ভোট সংসদে প্রদত্ত ভোট হিসেবে গণ্য হয় না এবং এখানে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রয়োগের কোনো সাংবিধানিক সুযোগ নেই।
সরকারের চিফ হুইপের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে শহীদুল্লাহ ফরায়জী বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে—এমন বক্তব্য ৭০ অনুচ্ছেদের আক্ষরিক অর্থ এবং সংবিধানের ৪৮(১) ও ১১৯ অনুচ্ছেদসহ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
সংগঠনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম বলেন, রাজনৈতিক সংস্কারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ৭০ অনুচ্ছেদের দৌরাত্ম্য কমানো। অথচ এখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ওপর ৭০ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতার কথা বলে ভয় দেখানো হচ্ছে, যা গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
আলোচনায় আরও অংশ নেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুবি আমাতুল্লাহ এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। তাঁরা বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রধান। এই পদটিকে দলীয় আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত করা হলে রাষ্ট্রপতি পদের সাংবিধানিক মর্যাদা ও ভাবমূর্তি গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ণ হবে।
আলোচনা সভা থেকে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের পক্ষ থেকে তিন দফা প্রস্তাবনা পেশ করা হয়:
১. সরকারের বক্তব্য প্রত্যাহার: রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য সংক্রান্ত চিফ হুইপের বক্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করে এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে।
২. নির্বাচন কমিশনের স্পষ্টীকরণ: রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সংসদের কার্যপ্রণালির অংশ নয়, বরং একটি স্বতন্ত্র নির্বাচন এবং এতে ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য নয়—এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।
৩. ৭০ অনুচ্ছেদের ক্ষেত্র সীমিতকরণ: সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের ওপর দলীয় বাধ্যবাধকতার পরিধি কেবল অর্থবিল ও সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করতে হবে।
হাসনাত কাইয়ূম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং প্রজাতন্ত্রের সর্বজনগ্রাহ্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের স্বার্থে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সংসদ সদস্যদের নিজেদের বিবেক ও স্বাধীন বিচারবোধ প্রয়োগের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

স্টাফ রিপোর্টার 



















