বিভাগের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও শিশু পার্ক প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত। তিনি বলেন, ময়মনসিংহ বিভাগকে অবহেলিত হিসেবে দেখতে চান না। বৃহত্তর ময়মনসিংহের উন্নয়নে সংসদ সদস্য, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চান তিনি।
রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুরে ময়মনসিংহ নগরীর সারিন্দা সবারি রিসোর্টে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন আয়োজিত ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ শীর্ষক এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী।
মন্ত্রী বলেন, এই সংবর্ধনা শুধু শিক্ষার্থীদের অর্জনের স্বীকৃতি নয়, বরং ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্য অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের হাত ধরেই বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশকে আরও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চান। এ লক্ষ্যে শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
ত্রিশালে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা
ময়মনসিংহে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতের অগ্রগতি বিবেচনায় ঢাকার অদূরে ময়মনসিংহের ত্রিশাল এলাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ বিষয়ে দ্রুত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালানো হবে।
তিনি আরও বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর সম্প্রসারণে ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উড়োজাহাজ সরবরাহ করতে প্রায় ১০ বছর সময় লাগবে। ২০৩১ সাল থেকে শুরু করে ২০৩৬-৩৭ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে উড়োজাহাজগুলো দেশে আসবে। তত দিনে বর্তমান বহরের অধিকাংশ উড়োজাহাজের পরিচালন মেয়াদ শেষ হয়ে আসবে। ভবিষ্যতের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, নিউইয়র্ক, সিডনি, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের মতো বিভিন্ন গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট চালুর সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সম্প্রসারণে এসব বিষয়ে কাজ করতে হবে।
পূর্ণাঙ্গ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ
ময়মনসিংহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, এ কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করতে হবে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে চেষ্টা করা হবে। প্রয়োজনে তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলবেন।
তিনি জানান, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উন্নয়নকাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এসব উন্নয়নকাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে যাবে। এ জন্য সবাইকে ধৈর্য ধারণ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।
পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, নেত্রকোনার বিরিশিরিকে জাতীয় পর্যায়ের একটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এমনভাবে এ স্থানকে উন্নত করা হবে, যাতে বৃহত্তর ময়মনসিংহের মানুষ নিজেদের এলাকার পর্যটনসম্ভাবনা নিয়ে গর্ব করতে পারেন এবং বিদেশি পর্যটকেরাও সেখানে ভ্রমণে আগ্রহী হন।
ময়মনসিংহের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নোয়াখালী, সিলেটসহ অন্যান্য অঞ্চলের মানুষ যেভাবে নিজেদের এলাকার উন্নয়নে এগিয়ে আসেন, ময়মনসিংহের মানুষকেও সেভাবে এগিয়ে আসতে হবে। বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তাদের বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের সবাই একসঙ্গে কাজ করলে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মাদকমুক্ত সমাজ ও পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, নিজেদের সাফল্যের পাশাপাশি সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে হবে। অনেক দরিদ্র মানুষ অর্থাভাবে পড়াশোনা করতে পারেন না, স্কুলে যেতে পারেন না। অনেকের খাবার, জমি ও ঘর নেই। তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। তবে এসব কাজ সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন।
মন্ত্রী আরও বলেন, এখন থেকেই এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মাদকের স্থান থাকবে না। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় আগ্রহী হবে, নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে এবং শৃঙ্খলা মেনে চলবে। অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সুশৃঙ্খল উপস্থিতি তাঁকে মুগ্ধ করেছে বলেও জানান তিনি।
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘ধর্ম যার যার, দেশ সবার’—এ বিশ্বাস ধারণ করে সবাইকে সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে। দুর্গাপূজায় কেউ যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
মন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক সরকার আসার আগে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে সবকিছু স্থবির হয়ে ছিল। এখন বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার পাশাপাশি ময়মনসিংহ বিভাগের ঐতিহ্য ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার আহ্বান প্রতিমন্ত্রীর
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীরাই বাংলাদেশের মুখ, প্রাণ ও ভবিষ্যৎ। তাদের কেউ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী কিংবা বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়ে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করবে। তারা ভালো খেলোয়াড় হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শিক্ষার্থীদের সঠিক পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তাদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি হওয়ার মতো নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরীক্ষায় নকল বন্ধ এবং মেধার ভিত্তিতে ফলাফল নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে পরীক্ষায় কারচুপি ও নকলের সুযোগ থাকবে না।
ময়মনসিংহে তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ
ময়মনসিংহের উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী বলেন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ময়মনসিংহে একটি তথ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হচ্ছে। সেখানে সাংবাদিকদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, আধুনিক সিনেপ্লেক্স এবং বিনোদনের নানা ব্যবস্থা থাকবে। সিনিয়র-জুনিয়র সাংবাদিকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এসব সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন। এ ধরনের তথ্য কমপ্লেক্স দেশের ৬৪টি জেলায় নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও তিনি জানান।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যারা
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মো. আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ, ময়মনসিংহ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ জাকির হোসেন, ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ এবং ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, গণমাধ্যমকর্মী, অভিভাবক, শিক্ষক ও জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

স্টাফ রিপোর্টার 


















