ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়ীয়া উপজেলার বরুকা গ্রামের বাসিন্দা মোঃ আমির আলী। সরকারি নথিতে তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধ, সেনাবাহিনী গেজেট নম্বর-১৭৪৪ এবং মুক্তিযোদ্ধা নম্বর ০১৬১০০০৮১১১-এ তাঁর নাম নথিভুক্ত। পিতা মৃত ওমেদ আলী মন্ডল এবং মাতা মৃত জহুরন নেছার এই পুত্র রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিয়ে বছরের পর বছর মুক্তিযোদ্ধার ভাতা ও সুবিধা ভোগ করে আসছেন।
কিন্তু তাঁর কাছে মহান মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে যা বেরিয়ে আসে তা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। একজন মুক্তিযোদ্ধার কাছে তাঁর রণক্ষেত্রের কথা, সহযোদ্ধাদের স্মৃতি, প্রশিক্ষণের বিবরণ জানতে চাওয়া সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রশ্ন। কিন্তু আমির আলী বলতে পারেননি কোথায় যুদ্ধ করেছেন, কে ছিলেন তাঁর কমান্ডার, কারা ছিলেন তার সহযোদ্ধা। বারবার জিজ্ঞেস করলেও তাঁর মুখ থেকে বের হয় কেবল একটি কথা ‘আমার মনে নাই।’ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক জানান, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা দশকের পর দশক পরেও সেই দিনগুলোর কথা স্পষ্টভাবে মনে রাখেন, কারণ সেটি ছিল তাঁদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই আমির আলীর এই সম্পূর্ণ স্মৃতিভ্রংশ স্থানীয় সচেতন মানুষদের কাছে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বরুকা ও আশেপাশের গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমির আলী গ্রামেই ছিলেন এবং মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেননি। তৎকালীন সময়ে তিনি এলাকায় একজন ভবঘুরে ও অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয় প্রবীণরা আরও জানান, আমির আলী সে সময় বরুকা গ্রামের নাপিত বাড়ির পোলো যোগীর কন্যার খুনের মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন। এই তথ্য যদি সত্য হয়, তাহলে একটি ফৌজদারি মামলার আসামি কীভাবে মুক্তিযোদ্ধার গেজেটভুক্তি পেলেন সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় কার?। ১৯৭৫ সালের পরে সেনাবাহিনীতে যোগদান করে কিভাবে সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা গেজেট ভুক্ত হলেন আমির আলী, প্রশ্ন স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এবং রাজনৈতিক তদবিরের মাধ্যমে আমির আলী মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করিয়ে নেন। বাংলাদেশে এ ধরনের জালিয়াতির নজির আগেও ঘটেছে, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময়ের তদন্তে শত শত ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার নাম বাতিল হয়েছে। কিন্তু আমির আলীর মতো অনেকেই এখনো তালিকায় রয়ে গেছেন বলে সচেতন নাগরিকরা অভিযোগ করছেন।
বর্তমানেও স্থানীয় অধিবাসীদের একটি বড় অংশ আমির আলীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করেন। অভিযোগ রয়েছে, মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘ বছর ধরে অবৈধভাবে জমি দখল, সরকারি ভাতা আত্মসাৎ এবং স্থানীয় প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত এবং কোটি মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে। যে বীর মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে দেশের জন্য লড়েছিলেন, তাঁদের সম্মানের সাথে আমির আলীর মতো ভুয়া সনদধারীদের নাম এক করা সেই মহান আত্মত্যাগকে কলুষিত করে। এটি শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় নয় এটি জাতির ইতিহাসের বিরুদ্ধে একটি অপরাধ। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকারের ইতিহাস তুলে ধরতে হলে এই ধরনের প্রতারণার অবসান ঘটানো অপরিহার্য।
এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ড. জাহাঙ্গীর আলম মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। তাঁর অভিযোগে দাবি করা হয়েছে আমির আলীর গেজেটভুক্তি নতুন করে তদন্ত করা, তদন্তে ভুয়া প্রমাণ হলে গেজেট বাতিল করে তালিকা থেকে নাম অপসারণ করা, অবৈধভাবে ভোগ করা সকল রাষ্ট্রীয় সুবিধা ফেরত আদায় করা। মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় এই অভিযোগে দ্রুত ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ নেবে এমনটাই প্রত্যাশা ফুলবাড়ীয়াবাসীর। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তাঁদের দাবি সরল, যিনি সত্যিই যুদ্ধ করেছেন, সম্মান পাক তিনি আর যিনি করেননি, তাঁর নাম মুছে যাক সেই পবিত্র তালিকা থেকে।

বিশেষ প্রতিনিধি 




















