জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার ৩ নম্বর ডোয়াইল ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে ঘুমন্ত অবস্থায় মো. ফিরোজ মিয়াকে গ্রেপ্তার এবং পরে তাঁর কাছ থেকে ১২ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তাঁর পরিবার। পরিবারের দাবি, ফিরোজ মিয়াকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরবর্তীতে ভবানীপুর বাজারে নিয়ে গিয়ে মাদক উদ্ধারের ঘটনা দেখানো হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশের এজাহার ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যে অসংগতির অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে পরিবার।
ফিরোজ মিয়া ভবানীপুর গ্রামের মৃত আব্দুল খালেকের ছেলে।
পরিবারের অভিযোগ, গত ২৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখ রাত আনুমানিক সাড়ে ৩টার দিকে সরিষাবাড়ী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শাহীন কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে ভবানীপুর গ্রামে ফিরোজ মিয়ার নিজ বাড়িতে অভিযান চালান। এ সময় তাঁকে ঘুমন্ত অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের কারণ জানতে চাইলে ফিরোজের স্ত্রী ও ছেলে তাঁদের জানানো হয়, ফিরোজ মিয়া পূর্বের একটি মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। এমনটাই দাবি পরিবারের সদস্যদের।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি থেকে গ্রেপ্তারের পর ফিরোজ মিয়াকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে ভবানীপুর বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ওয়াসিম ও রবিন নামে দুই ব্যক্তিকে সাক্ষী রেখে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরবর্তীতে মামলার এজাহারেও ওই দুই ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে পরিবারের দাবি।
তবে এ ঘটনায় সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা ওয়াসিমের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিবার। পরিবারের দাবি, সাংবাদিকের সঙ্গে মুঠোফোনে কথোপকথনে ওয়াসিম জানান, ফিরোজ মিয়াকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তারের পর প্রধান সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পুলিশ তাঁকে ডেকে নেয়। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে ও ভয়ে তিনি পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে সম্মতি দেন বলে দাবি করেছেন ওয়াসিম।
পরিবারের আরও অভিযোগ, মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ফিরোজ মিয়াকে গ্রেপ্তারের সময় ঘটনাস্থলে আরও দুই ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন এবং পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তাঁরা পালিয়ে যান। কিন্তু ফিরোজকে যদি তাঁর নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকে, তাহলে এজাহারে উল্লেখিত ঘটনাস্থল এবং সাক্ষীদের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক বলে দাবি পরিবারের।
অন্যদিকে, ফিরোজ মিয়াকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর সকাল ১০টার দিকে তাঁর স্ত্রী ও ছেলে এসআই শাহীনকে অনুরোধ করেন তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। পরিবারের দাবি, এ সময় তাঁদের কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলা হয়। পরে থানার বাইরে থেকে আসা এক ব্যক্তি ফিরোজকে ছাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে তাঁর স্ত্রীর কাছে ৩০ হাজার টাকা দাবি করেন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজেকে থানার বিভিন্ন কাজে সহযোগিতাকারী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি আরও জানান, কোনো সরকারি চাকরি করেন না এবং তাঁর বাসা থানার আশপাশে। তবে ওই ব্যক্তির পরিচয় এবং টাকা দাবির অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ ঘটনার পর পরিবারের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বিষয়টি জানানো হয়। পরিবারের দাবি, সাংবাদিক সরিষাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও এসআই শাহীনের কাছে মুঠোফোনে ফিরোজ মিয়াকে গ্রেপ্তারের কারণ জানতে চাইলে তাঁরা জানান, ফিরোজ পূর্বের একটি মাদক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি।
পরিবারের অভিযোগ, সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি জানতে পেরে এসআই শাহীন ক্ষুব্ধ হয়ে ফিরোজের স্ত্রী ও ছেলেকে থানার বাইরে চলে যেতে বলেন। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিষয়টি জানানোর পরিণতি সম্পর্কে তাঁদের সতর্ক করেন বলেও অভিযোগ করেছে পরিবার।
পরবর্তীতে মামলার চার্জশিটে ফিরোজ মিয়ার বিরুদ্ধে ১২ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের অভিযোগ আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার। এ কারণে গ্রেপ্তারের প্রকৃত ঘটনাস্থল, সাক্ষীদের উপস্থিতি এবং হেরোইন উদ্ধারের ঘটনাটি কীভাবে সংঘটিত হয়েছে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে পরিবার।
পরিবারের দাবি, ফিরোজ মিয়াকে যদি পূর্বের মামলার ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকে, তাহলে গ্রেপ্তারের সময়ই আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিষয়টি স্পষ্ট করা উচিত ছিল। একই সঙ্গে পরবর্তীতে মাদক উদ্ধারের ঘটনাটি কোথায় ও কীভাবে ঘটেছে, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ফিরোজ মিয়ার পরিবারের অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং পুলিশের বক্তব্য গ্রহণ করে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া গেলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট করার জন্য যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
পুলিশের বক্তব্য, এ প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য ও স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তথ্য পাওয়া গেলে তা সংযুক্ত করা প্রয়োজন।

স্টাফ রিপোর্টার 



















