আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নির্ধারিত একটি প্রক্রিয়া চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ। চাঁদ যখন পরিভ্রমণ অবস্থায় কিছুক্ষণের জন্য পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে পড়ে, তখন পৃথিবীর কোনো দর্শকের কাছে কিছু সময়ের জন্য সূর্য আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায়।
এটাই সূর্যগ্রহণ বা কুসুফ। আর পৃথিবী যখন তার পরিভ্রমণ অবস্থায় চাঁদ ও সূর্যের মাঝখানে এসে পড়ে, তখনই পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে চাঁদ কিছুক্ষণের জন্য অদৃশ্য হয়ে যায়। এটাই চন্দ্রগ্রহণ বা খুসুফ।
পবিত্র কোরআনে সূর্য-চন্দ্র প্রসঙ্গ
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি সৃষ্টি করেছি একটি প্রজ্বলিত বাতি।’ (সুরা নাবা ১৩) পবিত্র কোরআন আরো বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ চাঁদকে স্থাপন করেছেন আলোরূপে, আর সূর্যকে স্থাপন করেছেন প্রদীপরূপে।’ (সুরা নুহ ১৬)
‘আর তিনিই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন রাত, দিন, সূর্য ও চাঁদকে; এবং নক্ষত্ররাজিও তারই নির্দেশে নিয়োজিত। নিশ্চয় এতে বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে অনেক নিদর্শন। (সুরা নাহল ১৬)
‘আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন সূর্য ও চাঁদকে, যারা অবিরাম একই নিয়মের অনুবর্তী এবং তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন রাত ও দিনকে।’ (সুরা ইবরাহীম ৩৩)
হাদিসের আলোকে সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ
হযরত আবু বকর রা. বর্ণনা করেন, আমরা রসুল সা.-এর কাছে ছিলাম। এমন সময় সূর্যগ্রহণ শুরু হয়। রসুল সা. তখন উঠে দাঁড়ালেন এবং নিজের চাদর টানতে টানতে মসজিদে প্রবেশ করেন। আমরাও প্রবেশ করি। তিনি আমাদের নিয়ে সূর্য প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত দু’রাকাত নামাজ আদায় করেন। এরপর তিনি বলেন, ‘কারও মৃত্যুর কারণে কখনো সূর্যগ্রহণ কিংবা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। তোমরা যখন সূর্যগ্রহণ দেখবে তখন এ অবস্থা কেটে যাওয়া পর্যন্ত নামাজ আদায় করবে এবং দোয়া করতে থাকবে।’ (বুখারি ৯৮৩)
হযরত আবু মুসা রা. বলেন,
রসুল সা. -এর যুগে সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। তখন তিনি এই আশঙ্কায় উঠে দাঁড়ালেন যে, কিয়ামতের মহাপ্রলয় বুঝি সংঘটিত হবে। তিনি দ্রুত মসজিদে চলে আসেন। এরপর অত্যন্ত দীর্ঘ কিয়াম, দীর্ঘ রুকু ও দীর্ঘ সিজদার সঙ্গে নামাজ আদায় করেন। আমি আর কোনো নামাজে কখনো এমন (দীর্ঘ) দেখিনি।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সূর্য ও চন্দ্র’ আল্লাহর অন্যতম দুটি নিদর্শন। এগুলো কারো মৃত্যু কিংবা জন্মের জন্য ‘গ্রহণ’ হয় না, অতএব তোমরা যখন তা দেখবে তখন আল্লাহর কাছে দোয়া করবে, তাকবির বলবে, সালাত আদায় করবে এবং সদকা করবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)
সূর্যগ্রহণের নামাজ কিভাবে পড়ব
আরবিতে সূর্যগ্রহণকে ‘কুসুফ’ বলা হয়। আর সূর্যগ্রহণের নামাজকে ‘সালাতুল কুসুফ’ বলা হয়। দশম হিজরিতে যখন পবিত্র মদিনায় সূর্যগ্রহণ হয়, রাসুল (সা.) ঘোষণা দিয়ে লোকদের নামাজের জন্য সমবেত করেছিলেন। সেই নামাজের কিয়াম, রুকু, সিজদাসহ সব রুকন সাধারণ অভ্যাসের চেয়ে অনেক দীর্ঘ ছিল। সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণকালে মুমিনদের করণীয় হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে একত্র হয়ে সালাত আদায় করা এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকা। এ সালাত আদায় করা নফল। এই নামাজে আজান ও ইকামত দিতে হয় না। তবে লোকজন ডাকার জন্য ‘আস-সালাতু জামিয়া’ (নামাজ সমাগত) বা এ জাতীয় বাক্য ব্যবহার করে ডাকার অবকাশ রয়েছে। সমাবেশস্থলে জুমার নামাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত ইমাম উপস্থিত থাকলে তিনি সূর্যগ্রহণের সালাত জামাতে আদায় করাবেন। আর ইমাম বা তার প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকলে একা একা সালাত আদায় করা যাবে। এ সালাত অন্য সালাতের চেয়ে অধিক দীর্ঘ হওয়া উচিত। রাসুল (সা.) এ সালাতের কিরাত, কিয়াম, রুকু, সিজদাসহ অন্য আমলগুলোও অনেক দীর্ঘ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এ সালাতে কিয়াম, রুকু ও রুকু থেকে দাঁড়ানো অবস্থা অত্যধিক দীর্ঘায়িত করেছেন। এমনকি কিয়াম অবস্থায় প্রায় সুরা বাকারা তিলাওয়াত করার মতো সময় অতিবাহিত করেছেন এবং রুকু থেকে দাঁড়িয়ে এর চেয়ে তুলনামূলক কম সময় অবস্থান করেছেন। আর দ্বিতীয় রাকাত প্রথম রাকাতের চেয়ে ছোট করেছেন। তিনি কিয়ামের মধ্যে কিরাত ছাড়াও তাসবিহ, তাহলিল, তাকবির, তাহমিদ, দোয়া পড়েছেন বলে অন্য হাদিসে বর্ণিত আছে। সালাত আদায় শেষ হলে সূর্য পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত দোয়া করতে হয়। হানাফি মাজহাবে অন্য সালাতের মতো এ সালাতেও প্রতি রাকাতে একটি মাত্র রুকু আদায় করতে হয়। শাফিয়ি মাজহাবে প্রতি রাকাতে দুটি রুকু করতে হয়। অবশ্য হাদিসের বর্ণনাগুলোতে এ সালাতে রাসুল (সা.) দুই বা ততোধিক রুকু করেছেন বলেই উল্লেখ রয়েছে। এ সালাতের রাকাত সংখ্যা দুই। তবে চার রাকাত বা তার বেশিও আদায় করা যায়। সে ক্ষেত্রে প্রতি দুই বা চার রাকাতের পর সালাম ফিরাতে হবে। সালাতের শেষে কোনো খুতবা পড়তে হয় না। কোনো কোনো বর্ণনায় রাসুল (সা.) কর্তৃক খুতবা পাঠের কথা বর্ণিত থাকলেও তা সালাতের সংশ্লিষ্ট হিসেবে নয়; বরং তা ছিল ‘গ্রহণ’ সম্পর্কে জাহিলি যুগের ভ্রান্ত ধারণা নিরসনের জন্য দেওয়া বিশেষ বিবৃতি। (আল-আদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারি)

ডিজিটাল ডেস্ক 

























