বাংলাদেশ রেলওয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে ২০টি ডিজেলচালিত মিটারগেজ লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল প্রধান উন্নয়ন সহযোগী চীন। তবে দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে ঘোষিত এই প্রকল্প থেকে চীন শেষ পর্যন্ত মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চীনের পক্ষ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ইতিবাচক সাড় দিয়েছিল। ইঞ্জিনগুলো বাংলাদেশে আনার প্রক্রিয়া ও কারিগরি বিষয় নিয়ে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিকবার আলোচনাও হয়। কিন্তু ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তীতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলেও এ বিষয়ে কোনো ফলপ্রসূ আলোচনা না হওয়ায় চীন প্রকল্পটি থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে।
রেলওয়ে সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের লক্ষ্যে ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা (১৮৩৫৩৭.৯১ লাখ টাকা) সম্ভাব্য ব্যয় ধরে একটি পিডিপিপি প্রস্তুত করা হয়েছিল। এর মধ্যে চীন সরকার অনুদান হিসেবে ১ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা বহন করত এবং বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত অংশ ছিল ৪৪ কোটি টাকা, যা মূলত সরকারের শুল্ক ও কর বাবদ ব্যয় হতো। ইঞ্জিন ক্রয়ের পাশাপাশি পাঁচ বছরের খুচরা যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচও চীনের বহনের কথা ছিল। ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়ন মেয়াদ ধরা হয়েছিল।
কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট এবং উত্তরবঙ্গের বগুড়া, নাটোর, লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও পঞ্চগড় রুটে মিটারগেজ ট্রেনের ইঞ্জিনের তীব্র সংকট রয়েছে। অনেক ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়ায় শিডিউল বিপর্যয় নিত্যদিনের ঘটনা। নতুন এই ২০টি ইঞ্জিন যুক্ত হলে ট্রেনের রানিং টাইম বাড়ার পাশাপাশি নতুন রুটে ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি ও পণ্য পরিবহনে গতি আসত, যা জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, চীনের প্রস্তাবের এক বছর পর বাংলাদেশ থেকে পিডিপিপি পাঠানো হয়েছিল। চীন প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করে তাদের কারখানা পরিদর্শনের আগ্রহ দেখালেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যেন অনুদান হিসেবে ইঞ্জিনগুলো পাওয়া যায়।
প্রকল্পের এই স্থবিরতা সম্পর্কে সড়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, “অনুদানের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা না রেখে একটি বা দুটি দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ তৈরি করা উচিত। এই মুহূর্তে প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন কৌশলগত দিক থেকে লাভজনক। এই ২০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন অনুদান রেলের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ হতে পারত। ভারত বা জাপান যা দেয়নি, চীন তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল।”
তিনি আরও যোগ করেন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও প্রয়োজনীয় রোলিং স্টক ও কোচ না থাকায় রেল আজ কার্যত একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না করলে রেলের সুদূরপ্রসারী ক্ষতি হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে চীনের এই পিছিয়ে যাওয়াকে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে জটিলতা নিরসন করে দ্রুত চীনের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সংকট সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্টাফ রিপোর্টার 


















