ইউরোপের দেশ ইতালিতে ভালো চাকরি ও উচ্চ বেতনের লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর থানা-পুলিশের একটি দল সিলেটের শাহপরাণ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ওই নারী ও তার ভাইকে গ্রেপ্তার করে। তারা মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে দায়ের করা চারটি মামলার দীর্ঘদিন ধরে পলাতক আসামি ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ইছাকপুর গ্রামের বাসিন্দা মোছা. শোবি বেগম (৩০) এবং তার ভাই মো. শামছুল (২৮)। জগন্নাথপুর থানায় তাদের বিরুদ্ধে মানবপাচারের একাধিক সুনির্দিষ্ট মামলা থাকায় তারা আত্মগোপনে ছিলেন।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর জগন্নাথপুর থানার এসআই মতিউর রহমান, এসআই মোস্তাফিজুর রহমান, এসআই অনিক পাল এবং সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল শাহপরাণ থানা-পুলিশের সহায়তায় যৌথ অভিযান পরিচালনা করে তাদের আটক করে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চক্রটি মূলত তিন দেশ থেকে পরিচালিত একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট। শোবি বেগমের স্বামী মেশকার মিয়া এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে একজন ইতালিতে এবং অপরজন লিবিয়ায় অবস্থান করছেন। লিবিয়ায় থাকা ভাই আন্তর্জাতিক এই পাচার সিন্ডিকেটের আর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করেন। আর বাংলাদেশে অবস্থানরত শোবি বেগম ও তার ভাই শামছুল স্থানীয় বেকার যুবকদের ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে ধাপে ধাপে কোটি টাকা হাতিয়ে নিতেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরাসরি ইতালি পাঠানোর কথা বলে প্রথমে ভুক্তভোগীদের লিবিয়ায় পাঠানো হতো। সেখানে পৌঁছানোর পর শোবি বেগমের ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা মাফিয়া চক্রের সদস্যরা বিমানবন্দর থেকেই তাদের অপহরণ করে গহীন মরুভূমির টর্চার সেলে নিয়ে যেত। সেখানে খাবার ও পানি না দিয়ে লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে ফেলা, ইলেকট্রিক শক দেওয়া এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। প্রতিদিনের সেই নির্যাতনের ভিডিও বাংলাদেশে থাকা স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে আদায় করা হতো মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ।
প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার কলকলিয়া ইউনিয়নের সাদীপুর গ্রামের সইফুল মিয়া জানান, তাকে সরাসরি ইতালি পাঠানোর কথা বলে শোবি বেগম ও তার ভাইয়ের সিন্ডিকেট বিভিন্ন দফায় ২৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। পরবর্তীতে লিবিয়ায় বন্দি রেখে আরও টাকা দাবি করে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। একই গ্রামের আবু তাহের মিয়ার ছেলে বিন আমিনকে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২৫ লাখ টাকা এবং সেলিম মিয়ার কাছ থেকে ৪৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এছাড়া এমরান হোসেন আদিলসহ বেশ কয়েকজনকে একইভাবে জিম্মি করে নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গ্রেপ্তারের খবরে স্বস্তি প্রকাশ করলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও লিবিয়ার টর্চার সেলে বন্দি যুবকদের দ্রুত উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জগন্নাথপুর থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসআই নূর হোসেন জানান, গ্রেপ্তারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং রিমান্ডের আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না এবং লিবিয়া ও ইতালিতে অবস্থানরত অন্য সদস্যদের তথ্য সংগ্রহ করে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি 


















