জীবনের গোধূলিলগ্নে এসে বাবা-মায়ের ঠিকানা যখন বৃদ্ধাশ্রম হয়, তখন সমাজ ও পরিবারের নির্মম বাস্তবতাই যেন সামনে ভেসে ওঠে। সুপরিচিত সাহিত্যিক মাধুরী ব্যানার্জীর অনবদ্য অণুগল্প ‘প্রতিদান’-এ ফুটে উঠেছে এমন এক মর্মস্পর্শী পিতৃত্ব ও ত্যাগের গল্প, যা প্রতিটি বিবেকবান মানুষের মনে দাগ কেটে যায়।
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন অমলেন্দুবাবু। বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় বসে প্রতিদিন বিকেলে সূর্যাস্ত দেখা আর হাতে একটি পুরোনো ডায়েরি—এটাই ছিল তাঁর নিত্যদিনের রুটিন। স্ত্রী হারানোর পর একাই নিজের সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে যিনি ছেলেকে মানুষ করেছিলেন, তার পড়াশোনা থেকে শুরু করে চাকরি ও বিয়ে—সবকিছুর পেছনে উজাড় করে দিয়েছিলেন নিজের সব সঞ্চয়। সেই ছেলে অর্ণব বিদেশে চাকরি পাওয়ার পর একসময় ব্যস্ততার অজুহাতে বাবাকে পাঠিয়ে দেয় শহরের এক বৃদ্ধাশ্রমে।কোনো অভিযোগ না করে অমলেন্দুবাবু শুধু মৃদু হেসে বলেছিলেন, “তুই ভালো থাকিস, বাবা।”
এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ পাঁচ বছর। একদিন এক বর্ষার সন্ধ্যায় বৃদ্ধাশ্রমের দরজায় এসে দাঁড়ায় এক যুবক। জামাকাপড় ভিজে একাকার, চোখে তীব্র উৎকণ্ঠা। সে আর কেউ নয়—অর্ণবেরই ছেলে রাহুল। অমলেন্দুবাবুকে জড়িয়ে ধরে সে জানায়, অর্ণব আর বেঁচে নেই; মারা যাওয়ার আগে বাবা তাকে বলে গেছেন—‘আমি বাবার ভালোবাসার প্রতিদান দিতে পারিনি।’
দাদুকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার আকুল আবেদন জানিয়ে রাহুল বলে, “বাবা ভুল করেছিলেন, কিন্তু আমি তাঁর ভুলের প্রতিদান ভুল দিয়ে দিতে চাই না।”
তখন অমলেন্দুবাবু তাঁর পুরোনো ডায়েরির একটি পাতা খুলে নাতির হাতে তুলে দেন। সেখানে লেখা ছিল এক চিরন্তন সত্য—
“ভালোবাসার প্রতিদান ভালোবাসা দিয়েই দিতে হয়। দেরি হয়ে গেলেও।”
রাহুল চোখের জল মুছে দাদুর হাত শক্ত করে ধরে। সেদিন বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় বসে অমলেন্দুবাবুর মনে হয়েছিল, জীবনে নিঃস্বার্থভাবে দেওয়া ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না—কখনও না কখনও, কোনো না কোনো হৃদয় থেকে তার প্রতিদান ঠিকই ফিরে আসে।
এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রক্তের সম্পর্ক ও স্নেহের ঋণ চিরকালীন। সন্তান ভুল করতে পারে, কিন্তু মাতৃত্ব বা পিতৃত্বের নিখাদ ভালোবাসার প্রকৃত প্রতিদান কেবল ভালোবাসাই হতে পারে, তা যতই দেরিতে হোক না কেন।

বিশেষ প্রতিবেদন 


















