শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে নিজের ১২ কাঠা জমিকে গবেষণাক্ষেত্র বানিয়ে দীর্ঘ ২১ বছরের প্রচেষ্টায় দেশি ধানের ২৫টি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন কৃষক সেন্টু চন্দ্র হাজং। আধুনিক পরীক্ষাগার, উন্নত যন্ত্রপাতি ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা-সুবিধা ছাড়াই নিজের উদ্যোগে তিনি এ সাফল্য অর্জন করেছেন। তাঁর উদ্ভাবিত ধানের কয়েকটি জাত চাষ করে লাভবান হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
তবে দীর্ঘদিনের এই প্রচেষ্টার পরও উদ্ভাবিত জাতগুলোর সরকারি স্বীকৃতি ও বীজ প্রত্যয়ন না পাওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে বীজ বাজারজাত করতে পারছেন না তিনি।নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের চাটকিয়া গ্রামের বাসিন্দা সেন্টু হাজংয়ের বয়স ৫৫ বছর। কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া সেন্টু এসএসসি পাস করার পর অর্থাভাবে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেমে গেলেও নতুন কিছু উদ্ভাবনের আগ্রহ তাঁকে দমাতে পারেনি। নিজ উদ্যোগেই শুরু করেন দেশি ধানের জাত সংরক্ষণ ও নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজ।
জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করা এই কৃষক নিজের ১২ কাঠা জমিতে গড়ে তুলেছেন ৪৪০টি পরীক্ষামূলক প্লট। এসব প্লটে বিভিন্ন জাতের ধান চাষ করে দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তাঁর উদ্ভাবিত জাতগুলোর মধ্যে সেন্টু শাইল, সেন্টু পাইজাম, চিনি শাইল ও তুলশিমালা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে সেন্টু শাইল ও সেন্টু পাইজাম জাতের ধান স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। চলতি আমন মৌসুমেও এলাকার অনেক কৃষক এসব জাতের ধান চাষ করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৫ সালে একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ধানের জাত নিয়ে পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করেন সেন্টু হাজং। নতুন জাত উদ্ভাবনে তিনি সংকরায়ণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। একটি নতুন জাত তৈরি করে তার বৈশিষ্ট্য ও ফলন যাচাই করতে সাত থেকে আট বছর পর্যন্ত সময় লাগে। দীর্ঘ প্রচেষ্টায় প্রথম সফলতা আসে ‘সেন্টু শাইল’ উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে। পরে উদ্ভাবন করেন ‘সেন্টু পাইজাম’।
একটি পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে আবার নতুন করে কাজ শুরু করেন তিনি। এভাবে একের পর এক পরীক্ষা চালিয়ে নিজের নামে সেন্টু-১ থেকে সেন্টু-২৫ পর্যন্ত ২৫টি জাত উদ্ভাবন করেছেন বলে জানান তিনি। বর্তমানে আরও দুই শতাধিক ধানের জাত নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন এই কৃষক।
স্থানীয় কৃষক হাবিল উদ্দিন বলেন, “আমি দেড় একর জমিতে সেন্টু পাইজাম জাতের ধান লাগিয়েছি। এই ধানের ফলন ভালো, ভাত খেতেও সুস্বাদু। তাই আমি প্রতিবছর এই ধান আবাদ করি।”
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, ভালো ফলন ও ভাতের স্বাদের কারণে সেন্টু হাজংয়ের উদ্ভাবিত ধানের প্রতি তাঁদের আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে সেন্টু শাইল ও সেন্টু পাইজাম জাতের ধান নিয়মিত চাষ করছেন অনেকে।
দেশি ধানের জাত সংরক্ষণেও উদ্যোগ
নতুন জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি হারিয়ে যেতে বসা দেশি ধানের জাত সংরক্ষণেও কাজ করছেন সেন্টু হাজং। তাঁর জমিতে বগি, হালই, গোলাপী, মালঞ্চি, ময়নাগিড়ি, মালসিরা, অনামিয়া, পারিজাত, আপচি, কাইশাবিন্নি, মারাক্কাবিন্নি, শংবিন্নি, দুধবিন্নি, বিরই, চাপাল ও খাসিয়াবিন্নিসহ বিভিন্ন জাতের ধান পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা হচ্ছে।
বর্তমানে ঢেপা, চাপাল, পুরাবিন্নি ও নেদরাবিন্নিসহ আরও কয়েকটি জাত নিয়ে পরীক্ষা চালাচ্ছেন তিনি। এসব ধান চাষে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে গোবর ও নিজের তৈরি কেঁচো কম্পোস্ট সার ব্যবহার করেন।
সেন্টু হাজংয়ের মতে, দেশি ধানের অনেক জাত হারিয়ে যাওয়ার পথে থাকলেও সেগুলোর স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য স্বতন্ত্র। কোনো কোনো জাতের ধানে পোকার আক্রমণ তুলনামূলক কম দেখা যায়। তাই নতুন জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি পুরোনো জাতগুলো সংরক্ষণ করাকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
সরকারি স্বীকৃতি ও গবেষণা-সহায়তার প্রত্যাশা
দীর্ঘ ২১ বছর ধরে গবেষণার কাজ চালিয়ে গেলেও সেন্টু হাজংয়ের উদ্ভাবিত জাতগুলো এখনো সরকারি স্বীকৃতি পায়নি। বীজ প্রত্যয়ন না থাকায় প্যাকেটজাত করে বীজধান বাজারজাত করার সুযোগও তৈরি হয়নি। নিজস্ব পরীক্ষাগার, আধুনিক গবেষণার সরঞ্জাম কিংবা সরকারি বিশেষ সহায়তা ছাড়াই তাঁকে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
সেন্টু হাজং বলেন, “আমি এখনো কোনো সরকারি স্বীকৃতি পাইনি। আমার কোনো পরীক্ষাগার বা ল্যাবও নেই। উদ্ভাবিত বীজধানের প্রত্যয়ন না পাওয়ায় প্যাকেট করে বাজারে বিক্রি করতে পারি না। ভাঙা ঘরে থেকেই নতুন জাতের ধান উদ্ভাবনের চেষ্টা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “সরকারিভাবে যদি আমাকে একটি ল্যাব তৈরি করে দেওয়া হয়, তাহলে বীজধান উদ্ভাবনের বিভিন্ন উপকরণ ও তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। আমি যেন আরও নতুন জাত উদ্ভাবন এবং হারিয়ে যাওয়া দেশি জাতের ধান সংরক্ষণ করতে পারি, সে জন্য সরকারের কাছে সহযোগিতা কামনা করছি।”
সহযোগিতার আশ্বাস কৃষি বিভাগের
নালিতাবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বলেন, কৃষক সেন্টু হাজং দেশি ধানের জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে প্রশংসনীয় কাজ করেছেন। উপজেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁকে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সেন্টু হাজং তাঁর উদ্ভাবিত ধানের জাতগুলোর প্রত্যয়ন পাওয়ার জন্য জাতীয় বীজ প্রত্যয়ন বোর্ডে আবেদন করতে পারেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে উপযুক্ত মনে করলে প্রত্যয়ন দেবে। এ ক্ষেত্রে উপজেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।
সীমিত সামর্থ্য নিয়ে সেন্টু হাজংয়ের দীর্ঘদিনের এই প্রচেষ্টা দেশি ধানের বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও নতুন জাত উদ্ভাবনের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। তাঁর উদ্ভাবিত জাতগুলোর বৈশিষ্ট্য, ফলন ও উপযোগিতা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাচাই করে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া গেলে কৃষি খাতে এ উদ্যোগের সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হতে পারে। প্রয়োজনীয় গবেষণা-সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা পেলে দেশি ধানের জাত সংরক্ষণেও তাঁর প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

খন্দকার আব্দুল আলীম, নালিতাবাড়ী (শেরপুর) প্রতিনিধি 
























