দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হচ্ছে বাংলাদেশে। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে ভোট গ্রহণ হবে। নির্বাচনে ভোট দেবেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য।
তাহলে নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হওয়ার পরও রাষ্ট্রপতি পদটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্লেষকদের মতে, স্বাভাবিক সময়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হলেও রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক সংকটের সময় এই পদটির গুরুত্ব অনেক বেড়ে যেতে পারে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারী হিসেবে বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ভূমিকা সামনে আসে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের মতে, সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে সরাসরি খুব বেশি ক্ষমতা দেয়নি। তবে নেপথ্যে কোনো শক্তির সমর্থন থাকলে রাষ্ট্রপতির হাতে থাকা সাংবিধানিক ক্ষমতার প্রয়োগের প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দেশের অন্যতম নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর পছন্দের ব্যক্তিরাই রাষ্ট্রপতি হওয়ায় বাস্তবে অনেক সময় স্বাধীনভাবে ভূমিকা রাখার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়মুক্তিও পদটির বিশেষ গুরুত্ব তৈরি করেছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাকে আদালতে জবাবদিহির আওতায় আনা যায় না। একইভাবে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা যায় না।
কখনো ক্ষমতার কেন্দ্র, কখনো আনুষ্ঠানিক পদ
বাংলাদেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি পদের ক্ষমতা সবসময় একরকম ছিল না। স্বাধীনতার পর মুজিবনগর সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা চালু ছিল। ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশ আবার রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় ফিরে যায়।
১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা মূলত রাষ্ট্রপতির হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে রাষ্ট্রপতি পদই ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা অনেকটাই আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে সীমিত হয়ে যায়।
তবে এরপরও রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ঘটনা ঘটেছে।
সংকটের সময়ে সামনে এসেছে রাষ্ট্রপতি পদ
১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ও তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিমের বিরোধকে কেন্দ্র করে দেশে সেনা অভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
একই বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলের বাইরের ব্যক্তি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতি হন। একটি বিতর্কিত আইন অনুমোদনে তার অস্বীকৃতিকে কেন্দ্র করে সরকারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হলেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার নিরপেক্ষ ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছিল।
২০০২ সালে বিএনপি সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী দলীয় বিরোধের জেরে পদত্যাগ করেন। ওই সময় রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক সংকটের সময় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। পরে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের প্রেক্ষাপটে তাকে ওই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। তার সময়েই দেশে জরুরি অবস্থাও জারি করা হয়েছিল।
ব্যক্তি ও সময়ের ওপরও নির্ভর করে ক্ষমতার প্রভাব
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি কখনো ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন, আবার সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর তার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতির বাস্তব প্রভাব শুধু সংবিধানে নির্ধারিত ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। তিনি ব্যক্তি হিসেবে কতটা প্রভাবশালী, রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে, এসব বিষয়ও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে বর্তমান সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির দৈনন্দিন নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত হলেও রাজনৈতিক সংকটের সময়ে পদটির গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আর এ কারণেই ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শুধু কে নির্বাচিত হচ্ছেন, তা নয় ভবিষ্যতে তিনি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিকভাবে কী ধরনের ভূমিকা পালন করবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ডিজিটাল ডেস্ক 























