ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তিন দিনের মাথায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীনকে নান্দাইল উপজেলায় বদলি করা হয়েছে। বদলির আদেশে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘জনস্বার্থ’।
এদিকে সদর উপজেলার শিক্ষক ও সচেতন অভিভাবক মহল মনিকা পারভীনের বদলি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, দায়িত্ব পালনকালে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক সমস্যা, শিক্ষকদের সঙ্গে সমন্বয় এবং বিভিন্ন বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তাঁদের মতে, মনিকা পারভীন একজন ‘ডায়নামিক অফিসার’। ফলে তাঁর হঠাৎ বদলিতে সদরের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় এর প্রভাব পড়তে পারে।এটি শিক্ষক-অভিভাবকদের মূল্যায়ন হলেও তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মতামতও বিষয়টি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্ব বহন করে।
অভিযোগ দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে
মনিকা পারভীনের বদলি নিয়ে প্রশ্নের সূত্রপাত মূলত সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ দাবির অভিযোগকে কেন্দ্র করে।১৭ বছর বয়সী শাহেদ শরীফ আহমেদ তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর সরকারি পাওনা অর্থ তুলতে গিয়ে ঘুষ দাবির অভিযোগ করেন। পরে ঘুষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তিনি ‘ঘুষ.সাইট’ নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন। বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের কর্মচারী এ এইচ এম নাদিরুল হাসান সবুজ ও মো. মুজিবুর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়।
তদন্ত কমিটির প্রধান ও উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিকদার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানিয়েছেন, তদন্ত শেষে গত ৬ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তবে তদন্তে কী পাওয়া গেছে কিংবা কী সুপারিশ করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
এর তিন দিন পর, ৯ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আদেশে মনিকা পারভীনকে ময়মনসিংহ সদর থেকে নান্দাইল উপজেলায় এবং নান্দাইলের উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন নেছাকে সদর উপজেলায় বদলি করা হয়।
উল্লেখ্য, ঘুষদাতা তাঁর ভিডিও সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি ডিপিওর কার্যালয়ে ঘুষের টাকা দেওয়ার সময় এ এইচ এম নাদিরুল হাসান সবুজ সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, মনিকা পারভীনের বদলি প্রসঙ্গে ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বদলির আদেশটি জেলা কার্যালয় থেকে নয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে দেওয়া হয়েছে।
‘ঘুষ.সাইট’-এর উদ্যোক্তা শাহেদ শরীফও গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, মনিকা পারভীনের বিরুদ্ধে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগ ছিল না।
একই সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদনটি কী বলেছে, সেটিও প্রকাশ না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর মেলেনি।
বদলির কারণ ‘জনস্বার্থ’
৯ সেপ্টেম্বরের বদলি আদেশে মনিকা পারভীনের বদলির কারণ হিসেবে ‘জনস্বার্থ’ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জনস্বার্থের নির্দিষ্ট প্রশাসনিক কারণ কী—তা আদেশে উল্লেখ নেই।
মনিকা পারভীনের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তিন বছরের অধিক সময় একই কর্মস্থলে ছিলেন। সাধারণভাবে একজন কর্মকর্তার একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি থাকার সুযোগ নেই। অন্যদিকে নান্দাইলের উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন নেছা আগে থেকেই ময়মনসিংহ সদরে বদলির আবেদন করেছিলেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই দুই কর্মকর্তার কর্মস্থল পরিবর্তন করা হয়েছে বলে তিনি ধারণা করছেন।
শফিকুল ইসলামের বক্তব্য, ঘুষের অভিযোগসংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের কারণে মনিকা পারভীনের বদলি হয়েছে—এমনটা তিনি মনে করেন না।
মনিকা পারভীনের বদলি নিয়ে আলোচনায় সরকারি সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী এক স্থানে তিন বছরের চাকরিকালও একটি বিষয়। তবে তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের সময়ে অপসাংবাদিকতার চর্চা কোনো ঘটনাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে—এমন মতও রয়েছে গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের।
প্রশাসনের দৃষ্টিতে নির্ধারিত মেয়াদ শেষে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হতে পারে। আবার কোনো কর্মকর্তার কর্মস্থল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে কি না, সেটিও স্বচ্ছতার স্বার্থে পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন।
বদলি নিয়ে শিক্ষক-অভিভাবকদের আপত্তি
বদলির খবর প্রকাশের পর সদর উপজেলার শিক্ষক ও সচেতন অভিভাবকদের মধ্যে আপত্তি দেখা দিয়েছে।
তাঁরা বলেন, মনিকা পারভীন দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক যোগাযোগ, শিক্ষকদের সঙ্গে সমন্বয়, অবকাঠামোগত সমস্যা চিহ্নিত করা এবং শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন।
তাঁদের মতে, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দায়িত্ব কেবল অফিস পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যালয় পরিদর্শন, শিক্ষক-প্রশাসন সমন্বয়, বিদ্যালয়ের সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্যোগ নেওয়াও তাঁর দায়িত্বের অংশ। এসব ক্ষেত্রে মনিকা পারভীনের স্বতঃস্ফূর্ত দায়িত্বশীলতার কারণে সদরের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় একটি কার্যকর ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছিল বলে তাঁরা মনে করেন।
মনিকা পারভীনের বক্তব্য
বদলি সম্পর্কে মনিকা পারভীন বলেন, তাঁর কার্যালয় নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনা তৈরি হলেও তিনি তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব সবসময় যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করেছেন।
তাঁর ভাষ্য, বদলি আদেশে ‘জনস্বার্থে’ বদলির কথা বলা হয়েছে। তবে তাঁকে বদলির নির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি।
তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্যের অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে—উভয় বক্তব্যেই ‘ঘুষ.সাইট’-সংক্রান্ত ঘটনাকে তাঁর বদলির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
নান্দাইলের কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ
একই আদেশে নান্দাইলের উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন নেছাকে ময়মনসিংহ সদরে পদায়ন করা হয়েছে। ফলে বদলি প্রক্রিয়াটি শুধু মনিকা পারভীনকে ঘিরে নয়, নান্দাইলের প্রশাসনিক পরিস্থিতিকেও সামনে এনেছে।
গত ২৪ জুন নান্দাইল উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে ফজিলাতুন নেছার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।
অভিযোগে বিদ্যালয় মেরামত ও সংস্কারের বরাদ্দ, সিসি ক্যামেরা স্থাপন, শিক্ষক বদলি ও সংযুক্তি, অফিস সরঞ্জাম কেনাকাটা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়ে অনিয়মের কথা বলা হয়।
ফজিলাতুন নেছা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, অভিযোগটি বেনামি এবং বিষয়টি কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে। একই সঙ্গে তিন বছরের বেশি সময় একই কর্মস্থলে থাকার কারণে তিনি আগে থেকেই ময়মনসিংহ সদরে বদলির আবেদন করেছিলেন বলেও জানিয়েছেন।
ফলে দুই কর্মকর্তার বদলির ক্ষেত্রে একদিকে প্রশাসনিক মেয়াদ ও বদলির আবেদন, অন্যদিকে সাম্প্রতিক অভিযোগ ও তদন্ত—দুই ধরনের প্রেক্ষাপটই আলোচনায় এসেছে।
তদন্তের ফল কী?
মনিকা পারভীনের বদলি নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এখন তদন্ত প্রতিবেদন।
৬ সেপ্টেম্বর যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, সেটিতে কী পাওয়া গেছে—তা প্রকাশ্যে জানা যায়নি। যদি দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটিও জানা দরকার। অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরিস্থিতির শিকার যারা তারা স্বস্তি পাবেন।
এ অবস্থায় বদলিকে অভিযোগের ফল হিসেবে ধরে নেওয়া যেমন ঠিক হবে না, তেমনি তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যকার সময়ের ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার ব্যাখ্যা না থাকলেও জনমনে বিভ্রান্তি দূর হবে না।
এর পাশাপাশি সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াও জরুরি।
বদলি পুনর্বিবেচনার দাবি
শিক্ষক ও অভিভাবক সচেতন মহলের দাবি, সদর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় মনিকা পারভীন একজন পারফরম্যান্স ফোকাসড অফিসার। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষা অফিসার হিসেবে পুরস্কৃত এবং সম্মানিত। তাঁর কাজের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করে বদলি আদেশটি পুনর্বিবেচনা করা হলে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা হোক।
তাঁদের বক্তব্য, প্রশাসনিক প্রয়োজনে বদলি হতেই পারে। কিন্তু কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার প্রকৃতি, তদন্তের ফলাফল এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সুস্পষ্ট যোগসূত্র থাকা প্রয়োজন। একইভাবে অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মচারীদের বিষয়েও দ্রুত সিদ্ধান্ত হওয়া দরকার।

স্টাফ রিপোর্টার, ময়মনসিংহ 





















