শিল্পাঞ্চল গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তীব্র গ্যাস সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে শিল্পকারখানাগুলো। টানা ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে লাইনে গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার গ্যাসে চলছে কিছু কারখানা। তবে তৈরি পোশাক, ডাইং, সিরামিক ও স্টিলসহ বড় কারখানাগুলোর উৎপাদন প্রায় বন্ধ। ফলে হাজারো শ্রমিকের বেকার হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। একইসঙ্গে ব্যাংক ঋণের কিস্তি দিতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন উদ্যোক্তারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, কালিয়াকৈর ও চন্দ্রা শিল্পাঞ্চলের বেশিরভাগ কারখানার মেশিন নীরব পড়ে আছে। যেসব কারখানা কোনো রকমে চালু রাখা হয়েছে, গ্যাসের চাপ কম থাকায় সেখানে উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। ডাইং কারখানায় কাপড়ের রং ঠিকমতো আসছে না এবং সিরামিক কারখানায় পণ্য ফেটে নষ্ট হচ্ছে।
এক পোশাক কারখানা মালিক জানান, গ্যাস না থাকায় কারখানার বয়লার চালানো যাচ্ছে না। যে ৪০ শতাংশ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে, তার মানও অত্যন্ত খারাপ। এর ফলে বিদেশি ক্রেতারা কার্যাদেশ (অর্ডার) বাতিল করছেন। মানহীন এসব পণ্য ধ্বংস করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকছে না।
গ্যাস সংকটের কারণে ছোট-বড় অনেক কারখানা বন্ধ থাকায় বিপুল বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কারখানা না চলায় অনেক মালিক কারখানার ভাড়াই পরিশোধ করতে পারছেন না। ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নেওয়া উদ্যোক্তারা কিস্তির চাপে চরম হতাশায় ভুগছেন।
মো. রফিকুল ইসলাম নামের এক কারখানা মালিক বলেন, “ব্যাংক থেকে ৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে কারখানা করেছি। দুই মাস ধরে গ্যাস নেই, উৎপাদন নেই, আয়ও নেই। কিন্তু ব্যাংক থেকে প্রতিদিন ফোন দিচ্ছে। ছেলেমেয়ের স্কুলের বেতন পর্যন্ত দিতে পারছি না, আত্মহত্যার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে।”
কারখানা বন্ধ থাকায় কয়েক হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন। অনেক কারখানা ইতিমধ্যে শ্রমিকদের অর্ধেক বেতনে ছুটি দিয়ে দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “১৫ দিন ধরে কাজ নেই। বাসা ভাড়া আর বাজারের টাকা কোথা থেকে পাব? মালিক বলছে গ্যাস নেই, এখন আমরা কী করব?”
তিতাস গ্যাস সূত্র জানায়, কালিয়াকৈরে শিল্প ও আবাসিক মিলে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৪০-৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের অপ্রতুলতার কারণে রেশনিং করে এই সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
গাজীপুর চেম্বার অব কমার্সের নেতারা জানান, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্পোদ্যোক্তারা যে ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তা অপূরণীয়। তারা সরকারের কাছে আগামী ৩ মাসের ব্যাংক ঋণের কিস্তি, সুদ ও জরিমানা মওকুফের দাবি জানান। পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান তারা।
এ বিষয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এস এম ফখরুল হোসেন বলেন, “বিষয়টি আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। কালিয়াকৈর দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল। এখানে গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ থাকলে জাতীয় অর্থনীতিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই দ্রুত গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।”

স্টাফ রিপোর্টার 


















