শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে অটোরিকশাচালক খলিলুর রহমানের বাড়িতে চুরির ঘটনায় সোহান (১৯) নামের এক যুবকের বক্তব্য নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, চুরির পর সোহান প্রথমে নিজেই চুরির কথা স্বীকার করেন। পরে তার বক্তব্যে রাকিব নামের এক যুবকের নাম আসে। এরপর সোহান তার উস্তাদ স্যানিটারি মিস্ত্রি মুক্তার হোসেন ও তার স্ত্রী শাপলা বেগমের নাম বলেন। তবে রাকিবের বিরুদ্ধে চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান। মুক্তার হোসেন ও তার স্ত্রীও চুরির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
গত ৭ জুলাই নালিতাবাড়ী উপজেলার ২ নং নন্নী ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের কয়রাকুড়ি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। খলিলুর রহমানের ভাষ্য, ওই দিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে কোনো একসময় তার বাড়ি থেকে নগদ ২০ হাজার টাকা, চার আনা ওজনের দুই জোড়া স্বর্ণের কানের দুল, ছয় আনা ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন, এক আনা ওজনের একটি স্বর্ণের লকেট এবং তিন ভরি ওজনের এক জোড়া রুপার নুপুর চুরি হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন খলিলুর রহমান সপরিবারে পাশের ভটপুর গ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যান। রাত ১০টার দিকে বাড়ি ফিরে তারা ঘরের ভেতরে থাকা প্লাস্টিকের ওয়ারড্রোবের ড্রয়ারের তালা খোলা দেখতে পান। পরে ড্রয়ারে রাখা টাকা ও স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়নি।
চুরির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। একপর্যায়ে পার্শ্ববর্তী এলাকার চাঁন মিয়ার ছেলে সোহানের নাম সামনে আসে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, সোহান তাদের কাছে চুরির সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন।
খলিলুর রহমান বলেন, চুরির দিন দুপুর পর্যন্ত সোহান তার সঙ্গে ছিলেন। ঘটনার পর সোহানের আচরণ তার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়। পরে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে সোহান নিজেই চুরি করার কথা স্বীকার করেন।
স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য, সোহানের কাছে চুরি করা টাকা ও স্বর্ণালংকার কোথায় রাখা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি নিজের ঘরের টাঙে রাখার কথা বলেন। সেখানে খোঁজ করেও টাকা বা স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়নি। পরে সোহান বলেন, স্বর্ণালংকার বারোমারী বাজারের স্বর্ণকার আব্দুর রউফের দোকানে বিক্রি করেছেন। তবে সেখানে খোঁজ নিয়ে আব্দুর রউফ সোহানকে চেনেন না এবং তার কাছে এ ধরনের কোনো স্বর্ণালংকার বিক্রি হয়নি বলে জানা যায়।
এরপর সোহানের বক্তব্যে রাকিব নামের এক যুবকের নাম আসে। সোহানের ভাষ্য অনুযায়ী, চুরির সময় রাকিব শার্ট ও লুঙ্গি পরা ছিলেন। তবে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে রাকিবের বিরুদ্ধে চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এরপর সোহানের বক্তব্যে আসে তার উস্তাদ স্যানিটারি মিস্ত্রি মুক্তার হোসেন ও মুক্তারের স্ত্রীর নাম। সরেজমিনে কথা বলার সময় সোহান দাবি করেন, মুক্তার হোসেন ও তার স্ত্রী চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাদের সহযোগিতা করেছিলেন।
সোহানের ভাষ্য, মুক্তারের স্ত্রী তাকে বিভিন্নভাবে ভয় দেখিয়েছেন এবং মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছেন। মুক্তার ও তার স্ত্রীর নাম যেন তিনি প্রকাশ না করেন, সে জন্য তাকে চাপ দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে একেক সময় একেক ব্যক্তির নাম বলেছেন বলেও দাবি তার।
তবে সোহানের এসব বক্তব্যের পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একই ঘটনায় তার বক্তব্যের বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির নাম আসায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে সোহানের মা জুলেখা বেগম (৬০) বলেন, মুক্তারের স্ত্রী তাদের বাড়িতে এসে তার ভাতিজার স্ত্রীর কাছে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার দাবি, ওই টাকা নেওয়ার বিনিময়ে সোহান বা তাদের পরিবারের কেউ যেন মুক্তার ও তার স্ত্রীর নাম প্রকাশ না করেন, সে জন্যই এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
তবে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাবের এই দাবির সমর্থনে স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মুক্তারের স্ত্রী এ বিষয়ে কী বলেছেন, সেটিও পুলিশের তদন্তে যাচাই হওয়ার বিষয়।
চুরির ঘটনা নিয়ে স্থানীয়ভাবে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে উপস্থিত মো. ফিরোজ্জামান বলেন, সোহানের কাছে প্রথমে রাকিবুলের নাম বলার কারণ জানতে চাওয়া হলে সে মুক্তার ও তার স্ত্রীর চাপের কথা বলে। পরে আবার মুক্তার ও তার স্ত্রীকে চুরির ঘটনায় জড়িত বলে দাবি করে সোহান।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন এরশাদ আলম, হারুন অর রশিদ ও সাবেক ইউপি সদস্য হাবিবুর রহমান (হবি মেম্বার)। তাদের ভাষ্য, স্থানীয় বৈঠকগুলোতে মুক্তার বিষয়টি দ্রুত সমাধানের কথা বলেছেন। তবে তারা কেউই মুক্তার বা তার স্ত্রীর চুরির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণের কথা জানাননি।
মুক্তার হোসেন চুরির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সোহানের বক্তব্যকে ব্যবহার করে একটি পক্ষ তাকে চুরির ঘটনায় জড়ানোর চেষ্টা করছে। চুরি যাওয়া টাকা ও স্বর্ণালংকারের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য তাকে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
মুক্তার বলেন, “আমি চুরির সঙ্গে জড়িত নই। আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। চুরি যাওয়া টাকা বা স্বর্ণালংকার আমার কাছে নেই।”
চুরির ঘটনা নিয়ে বিরোধের মধ্যে গত ২৩ আগস্ট দুই পক্ষের মধ্যে ঝগড়ার ঘটনা ঘটে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। মুক্তারের পরিবারের অভিযোগ, একপর্যায়ে তার মা রহিমা বেগম ও খালা ফরিদা বেগমকে খলিলুর রহমানের বাড়িতে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। এ ঘটনায় মুক্তারের বাবা মোহাব্বত আলী নালিতাবাড়ী থানায় অভিযোগ করেন।
তবে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে শুধু কথা-কাটাকাটি হয়েছিল। কাউকে মারধর করা বা গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখার কোনো ঘটনা ঘটেনি।
অন্যদিকে খলিলুর রহমানও চুরির ঘটনায় মুক্তার হোসেন ও সোহানের বিরুদ্ধে নালিতাবাড়ী থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই অভিযোগের সঙ্গে এলাকাবাসীর গণস্বাক্ষরও রয়েছে। চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে বিরোধ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
খলিলুর রহমান বলেন, “চুরির পর প্রথমে আমি কাউকে সন্দেহ করিনি তবে সোহানের আচরণ আমার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে। পরে সোহান নিজেই চুরি করার কথা স্বীকার করে। এরপর সে রাকিবুল, মুক্তার ও মুক্তারের স্ত্রী শাপলা বেগমের নাম বলে। আমি চাই, চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধার হোক এবং প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসুক।”
খলিলুর রহমান আরও বলেন, “আমি গরিব মানুষ। অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাই। অনেক কষ্ট করে চলি। আমার ঘরে যে চুরি হয়েছে, পুলিশ যেন ভালোভাবে তদন্ত করে আসল ঘটনা বের করে। আমি চাই, তদন্তের মাধ্যমে এর একটা ভালো সমাধান হোক।”
এ বিষয়ে নালিতাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুজ্জামান বলেন, “এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
চুরির ঘটনায় সোহানের বক্তব্যের বিভিন্ন পর্যায়ে রাকিবুল, মুক্তার হোসেন ও তার স্ত্রীর নাম আসা, পরে নাম পরিবর্তনের পেছনে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ এবং চুরি যাওয়া টাকা ও স্বর্ণালংকার এখনো উদ্ধার না হওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। একই সঙ্গে সোহানের বক্তব্যের কোন অংশ সত্য, চুরির সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না এবং চুরি যাওয়া মালামাল কোথায়—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন পুলিশের তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।

তাওহিদুজ্জামান (রোমান), শেরপুর জেলা প্রতিনিধি 



















