শেরপুরের বিভিন্ন হাট-বাজারে শুকনো ধান কাঁচা ধানের দামে বিক্রি হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। উৎপাদন খরচ ও অতিরিক্ত শ্রমের পরও প্রত্যাশিত মূল্য না পাওয়ায় অনেক কৃষককে চোখের জল ফেলতে দেখা গেছে।
নালিতাবাড়ী বাজারে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক ছাত্তার আলী আক্ষেপ করে বলেন, “অনেক আশা নিয়ে ধান শুকাইছিলাম। ভেবেছিলাম কয়েকদিন পর দাম বাড়বে। কিন্তু বাজারে এসে দেখি কাঁচা ধানের যে দাম ছিল, এখনও সেই দামেই বিক্রি হচ্ছে। পরিশ্রম আর আশা সবই আজ মূল্যহীন হয়ে গেছে।”
তিনি জানান, ঘন ঘন বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন কৃষকরা। “কত কষ্ট করে ধান শুকাইছি, সেটা শুধু আমরাই জানি,”—যোগ করেন তিনি।
একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেন কৃষক সোহাগ মিয়া। তিনি বলেন, “ধান শুকানোর জন্য যে অতিরিক্ত পরিশ্রম করেছি, তা বৃথা গেছে। বাজারে ধানের দাম বাড়েনি। এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করছি।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বোরো মৌসুমে শেরপুরে ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯১ হাজার ৯৪৯ হেক্টর জমি। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৯১ হাজার ৮১১ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৭৫৯ মেট্রিক টন, আর উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ৮৪ হাজার ৯৮৬ মেট্রিক টন, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭৭৩ মেট্রিক টন কম।
সম্প্রতি শেরপুর সদর, নকলা ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, শুকনো ধানও কাঁচা ধানের কাছাকাছি দামে বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হলেও বাজারে এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি।
সরকার নির্ধারিত মণপ্রতি ধানের মূল্য ১ হাজার ৪৪০ টাকা হলেও অধিকাংশ ব্যবসায়ী ১ হাজার টাকার বেশি দামে ধান কিনছেন না বলে অভিযোগ কৃষকদের।
কৃষক ও ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে মোটা ধান প্রতি মণ ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা, চিকন ধান ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, কাটারি ধান ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা, পুরাতন এজেড ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৪০ টাকা এবং সেন্টু পাইজাম ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে বাজারভেদে দামের কিছুটা তারতম্য রয়েছে।
নকলা ধানহাটির ব্যবসায়ী হাফিজুল হাসান বলেন, “ধানের বাজার কম থাকার সুনির্দিষ্ট কারণ আমাদের জানা নেই। তবে শুনেছি অনেক মিল মালিক বিদেশি চাল কিনছেন, এটিও একটি কারণ হতে পারে।”
ধান ব্যবসায়ী সাইদুল ইসলাম বলেন, “আমরা বিভিন্ন জাতের ধান ১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত কিনছি। শুকনো ধানের বাজার তুলনামূলক কম থাকার কারণ আমাদের জানা নেই। বাজারে যে দামে বিক্রি হয়, সে অনুযায়ী আমরা ক্রয় করি।”
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে ধান শুকানোর অতিরিক্ত শ্রম। কিন্তু বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকদের আর্থিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
নকলা উপজেলার কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, “এক মণ ধান উৎপাদন থেকে শুরু করে শুকিয়ে গোলাজাতকরণ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা খরচ হয়। অথচ বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ১ হাজার টাকায়।”
নালিতাবাড়ী উপজেলার কৃষক হালিম উদ্দিন বলেন, “কাঁচা ধান আর শুকনো ধানের দামে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। তাহলে আমাদের অতিরিক্ত পরিশ্রমের মূল্য কোথায়?”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “ধানের বাজারদর নির্ধারণ বা তদারকির বিষয়টি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত নয়। এ বিষয়ে কৃষি বিপণন বিভাগ ভালো বলতে পারবে।”
তবে শেরপুর কৃষি বিপণন কর্মকর্তার কার্যালয়ের মাঠ ও বাজার পরিদর্শক মো. আলমগীর হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় কৃষকের লোকসান বাড়বে এবং ভবিষ্যতে ধান উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

খন্দকার আব্দুল আলীম,শেরপুর প্রতিনিধি 



















